সৌগত ভট্টাচার্য: উনিশ শতকের ভারতে দূরপাল্লার পথিকদের সাথে মিশে গিয়ে ছদ্মবেশে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যার পর সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনা ব্রিটিশ নথিতে ‘ঠগী’ নামে পরিচিত লাভ করে। ব্রিটিশ প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, এরা কেবল সাধারণ অপরাধী ছিল না, বরং গোপন সংঘ ও দেবী কালীর উপাসক হিসেবে ধর্মীয় বিচারে মানুষ হত্যা করত। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এই বাস্তব অপরাধের চারপাশে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী এক কাল্পনিক আতঙ্কের গল্প তৈরি করেছিল।
ঠগীদের অস্তিত্বের উল্লেখ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে, বিশেষ করে ১৭৬৫ থেকে ১৭৮২ সালের মধ্যে জেমস ফোর্বসের লেখায় 'ফাঁসিগর' নামে পাওয়া যায়। তবে ১৮৩০-এর দশকে উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান ঠগী দমনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ধৃতদের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে ১৮৩৯ সালে তাঁর বই 'দ্য ঠগস অর ফাঁসিগার্স অব ইন্ডিয়া' প্রকাশিত হয় এবং তিনি ঠগী দমন অভিযানের প্রধান আধিকারিক নিযুক্ত হন। ১৮৩৬ সালের কঠোর আইনের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত না হলেও কেবল গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসির বিধান রাখা হয়।
ইতিহাসবিদ কিম ওয়াগনারের মতে, উপমহাদেশে সংগঠিত ডাকাতি ও হত্যার বাস্তব অস্তিত্ব থাকলেও ব্রিটিশদের বর্ণিত সর্বব্যাপী, বংশগত ও ধর্মীয় হত্যাকারী সম্প্রদায়ের চিত্রটি ছিল অত্যন্ত অতিরঞ্জিত। গবেষক মার্ক ব্রাউনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঠগী দমন কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ছিল না; এটি ছিল ভারতীয় সমাজকে চিহ্নিত, শ্রেণিবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করার এক প্রশাসনিক মাধ্যম।
এই রহস্যময় অপরাধের গল্প ব্রিটেনজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করে। ১৮৪৩ সালে 'ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ'-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ফিলিপ মিডোজ টেলরের জনপ্রিয় উপন্যাস 'কনফেশনস অব আ ঠগ' (১৮৩৯) ভিক্টোরীয় সাহিত্য ও জনমানসে ঠগীদের এক ভয়াল রূপে তুলে ধরে। অন্যদিকে, জবলপুরে ধৃত ঠগীদের জন্য শিল্পশিক্ষা কেন্দ্র তৈরি করে পুনর্বাসনের উদ্যোগও নেওয়া হয়। পরিশেষে, সংগঠিত পথিক হত্যার বাস্তব ঘটনা এবং তাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশদের তৈরি ধর্মীয় ও অপরাধমূলক কাঠামোর সমন্বয়েই উনিশ শতকের ঠগী ইতিহাসের জটিল প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে।