প্রায় ২৭ বছর গুগলে। সার্চ থেকে এআই—প্রযুক্তি দুনিয়ার একের পর এক যুগান্তকারী প্রকল্পের সঙ্গে নাম জড়িয়ে থাকা জেফ ডিন এ বার নিজেই নামলেন স্টার্টআপের ময়দানে। আর নতুন সংস্থা প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাল তাঁর পিচ ডেক। কারণ, সেখানে ব্যবসার প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি চমক দিচ্ছে প্রতিষ্ঠাতা দলের পরিচয়।
নতুন সংস্থার নাম ‘ডিসকভারি লুপ’। লক্ষ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা তথ্য বিশ্লেষণের মধ্যে আটকে না রেখে তাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ‘গবেষক’-এর ভূমিকায় নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, কোন পরীক্ষা করা হবে তা ভাবা, সেই পরীক্ষা চালানোর ব্যবস্থা করা, ফলাফল বিশ্লেষণ করা এবং তার ভিত্তিতে পরের পরীক্ষা—এই গোটা চক্রকেই যতটা সম্ভব স্বয়ংক্রিয় করে ফেলতে চায় জেফ ডিনের দল।
পিচ ডেক যেন ‘সাফল্যের তালিকা’
স্টার্টআপের জন্য সাধারণত পিচ ডেকে থাকে বাজারের আকার, ব্যবসার সম্ভাবনা, আয় করার পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির হিসাব। জেফ ডিনের ডেক কিন্তু অনেকটাই আলাদা। সেখানে প্রতিষ্ঠাতা দলের অতীত কাজের তালিকাই যেন সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। দলের সদস্যরা গুগলের সার্চ, বিজ্ঞাপন, Gmail, Gemini এবং TPU-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও পণ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁদের কাজের পরিধি শুধু গুগলের পণ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দলের সদস্যদের সঙ্গে কাজ করা বহু গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ পরবর্তীতে OpenAI, Anthropic, Mistral-সহ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এআই সংস্থার নেতৃত্বে পৌঁছেছেন।
ফলে সমাজমাধ্যমে ডেকটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রযুক্তি দুনিয়ায় রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। কেউ লিখেছেন, এটি সম্ভবত ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ পিচ ডেকগুলির একটি। আবার কারও রসিক মন্তব্য—ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা জেফ ডিনকে বেছে নেন না, জেফ ডিনই ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বেছে নেন!
চার ‘হেভিওয়েট’ এক ছাতার নীচে
ডিসকভারি লুপের প্রতিষ্ঠাতা দলের চার সদস্যই গুগলের অত্যন্ত পরিচিত নাম—জেফ ডিন, সঞ্জয় ঘেমাওয়াত, কুয়ক লে এবং ওরিয়ল ভিনিয়ালস। ডিন গুগলের অন্যতম প্রাচীন কর্মী। ১৯৯৯ সালে সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর সার্চের পরিকাঠামো থেকে শুরু করে গুগলের মেশিন লার্নিং এবং আধুনিক এআই ব্যবস্থার বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি Google Brain-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং পরবর্তী সময়ে গুগলের গবেষণা ও এআই নেতৃত্বের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। সঞ্জয় ঘেমাওয়াতও গুগলের শুরুর দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিবিদ। Google File System, MapReduce এবং Bigtable-এর মতো বড় আকারের কম্পিউটিং পরিকাঠামোর সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। কুয়ক লে ছিলেন Google Brain-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মেশিন লার্নিং গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আর ওরিয়ল ভিনিয়ালস গুগল ডিপমাইন্ডের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং Gemini-র প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও যুক্ত ছিলেন।
এআই দিয়ে ‘গবেষক’ বানানোর পরিকল্পনা
ডিসকভারি লুপের মূল ভাবনাটি বেশ উচ্চাভিলাষী। এখন কোনও নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা প্রযুক্তিগত উন্নতির ক্ষেত্রে গবেষকরা একটি ধারণা তৈরি করেন। তার পর পরীক্ষা করেন, ফলাফল দেখেন, ভুল হলে নতুন পদ্ধতি নিয়ে আবার পরীক্ষা করেন। এই প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং একসঙ্গে সীমিত সংখ্যক পরীক্ষাই করা সম্ভব। জেফ ডিনের দল সেই জায়গাটিই বদলাতে চাইছে। তাদের পরিকল্পনা—এআইকে ব্যবহার করে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা। হাজার হাজার ‘experimental loop’ পাশাপাশি চলতে পারে। ফলাফল দেখে এআই আবার নতুন পরীক্ষা প্রস্তাব করবে। অর্থাৎ মানুষের ধারাবাহিক হস্তক্ষেপের জায়গায় তৈরি হবে অনেক বেশি দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয় গবেষণার ব্যবস্থা।
প্রথম লক্ষ্য মেশিন লার্নিং, পরে ওষুধ থেকে চিপ
প্রথম পর্যায়ে ডিসকভারি লুপ নিজেদের প্রযুক্তি উন্নত করতে মেশিন লার্নিং গবেষণাতেই জোর দেবে। এমনকি নিজেদের তৈরি সিস্টেমকেই নিজেদের ‘প্রথম গ্রাহক’ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পর লক্ষ্য আরও বড়—কম্পিউটার চিপের নকশা, জীববিজ্ঞান, ওষুধ আবিষ্কার, নতুন উপাদান তৈরি-সহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই-চালিত পরীক্ষার ব্যবহার। এখানেই প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। কারণ, সফল হলে কোনও গবেষণাগারে যেখানে একটি পরীক্ষা করতে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ লাগে, সেখানে অত্যন্ত বড় কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করে একসঙ্গে হাজার হাজার সম্ভাব্য সমাধান পরীক্ষা করা যেতে পারে।
AI researcher! এটাই কি পরের বিপ্লব?
এআই এত দিন মূলত মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, লেখা তৈরি করেছে, ছবি বানিয়েছে, কোড লিখেছে কিংবা তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। ডিসকভারি লুপের লক্ষ্য তার থেকেও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। প্রতিষ্ঠাতাদের ধারণা, এআই শুধু গবেষণায় সাহায্য করবে না—এআই নিজেই গবেষণার একটি সক্রিয় অংশ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, মানুষ সমস্যা নির্ধারণ করবে, আর এআই সম্ভাব্য সমাধান খুঁজতে ধারাবাহিক ভাবে পরীক্ষা চালাবে। সেই পরীক্ষার ফলাফল থেকেই নতুন ধারণা তৈরি হবে। পরের ধাপে সেই ধারণা ফের পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। এই পদ্ধতি কার্যকর হলে গবেষণার গতি বহুগুণ বাড়তে পারে বলেই মনে করছে সংস্থাটি।
কোটি কোটি ডলারের আস্থার ইঙ্গিত
সংস্থাটি ইতিমধ্যেই একাধিক বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থার সমর্থন পেয়েছে। প্রাথমিক বিনিয়োগ পর্বে Khosla Ventures এবং Radical Ventures নেতৃত্ব দিচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে Kleiner Perkins, Lightspeed এবং Doerr Capital-এর মতো বিনিয়োগকারী। গুগলের মূল সংস্থা Alphabet-ও বিনিয়োগকারী হিসেবে থাকছে এবং ক্লাউড পার্টনার হিসেবে কাজ করবে। অর্থাৎ, গুগল ছাড়লেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হচ্ছে না। বরং যে প্রযুক্তি সাম্রাজ্য জেফ ডিনকে প্রায় তিন দশক ধরে তৈরি করেছে, সেই Alphabet-ই এখন তাঁর নতুন উদ্যোগের অংশীদার।
গুগলের জন্য বড় ধাক্কা?
তবে জেফ ডিনের প্রস্থান নিঃসন্দেহে গুগলের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু ডিন নন, তাঁর সঙ্গে গুগলের আরও তিন গুরুত্বপূর্ণ গবেষকের বেরিয়ে যাওয়া এআই প্রতিযোগিতার সময়ে সংস্থার জন্য বড় প্রতীকী ধাক্কা। গুগল গত কয়েক বছরে Gemini-সহ নিজস্ব এআই পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সেই সময়েই একসঙ্গে এতগুলি অভিজ্ঞ মুখের নতুন সংস্থায় চলে যাওয়া প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রতিভা ধরে রাখার লড়াইকে ফের সামনে এনে দিয়েছে।
‘পিচ ডেক’ই যখন সবচেয়ে বড় বার্তা
জেফ ডিনের নতুন উদ্যোগের পিচ ডেক নিয়ে এত আলোচনা হওয়ার আসল কারণ সম্ভবত এখানেই। সাধারণ স্টার্টআপকে বিনিয়োগকারীর সামনে প্রমাণ করতে হয়—‘আমরা কেন সফল হব?’ জেফ ডিন এবং তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা যেন উল্টো—‘এই চারজন একসঙ্গে কী করতে পারেন?’ সার্চ ইঞ্জিনের পরিকাঠামো, বড় মাপের কম্পিউটিং, মেশিন লার্নিং, আধুনিক এআই এবং Gemini-র মতো প্রযুক্তির পিছনে কাজ করা চার বিজ্ঞানী যখন বলেন তাঁরা এ বার এআই দিয়ে গবেষণার গোটা প্রক্রিয়াটাই বদলাতে চান, তখন তাঁদের পিচ ডেকের কয়েকটি স্লাইডই যেন যথেষ্ট। আর সেই কারণেই প্রযুক্তি দুনিয়ায় এখন একটাই প্রশ্ন—ডিসকভারি লুপ কি শুধু আরও একটি এআই স্টার্টআপ, নাকি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পদ্ধতিই বদলে দেওয়ার প্রথম বড় পদক্ষেপ?