ঢাকা, নিউজ ডেস্ক: হিমালয়কে বলা হয় এশিয়ার জলভাণ্ডার। তুষার, হিমবাহ ও অসংখ্য নদীর উৎস এই পর্বতমালা শুধু নেপাল, তিব্বত বা ভারতকেই নয়, বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশগুলোকেও জীবন ও জীবিকার সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে। কিন্তু সেই হিমালয় যখন হঠাৎ ভয়ংকর রূপ নেয়, তখন তার অভিঘাত সীমান্তের কাঁটাতার মানে না। মুহূর্তের মধ্যে নদী হয়ে ওঠে ধ্বংসের স্রোত, পাহাড়ের পাদদেশের জনপদ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে, আর মানুষের বহু বছরের বসতি মিশে যায় কাদা ও ধ্বংসস্তূপে।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা সেই নির্মম বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। হিমবাহ ধসের পর লেন্দে নদীতে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেই স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের জনপদগুলোতে আঘাত হানে। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র—কোনোটিই রক্ষা পায়নি। নদীর তীরবর্তী অনেক জনবসতি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই বিপর্যয়ের মাত্রা কেবল বসতবাড়ি ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মানুষের জীবন, জীবিকা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো একই সঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছে। নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক চিরন্তন। নদী যেমন জীবন দেয়, তেমনি কখনো কখনো সেই নদীই হয়ে ওঠে ভয়াবহতার প্রতীক। পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে এই দ্বৈততা আরও তীব্র। কারণ পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির সঙ্গে যখন পাথর, বালি, কাদা ও বিশাল ধ্বংসস্তূপ যুক্ত হয়, তখন তা সাধারণ বন্যার পানির মতো আচরণ করে না। সেটি হয়ে ওঠে এক ধরনের চলমান ধ্বংসযজ্ঞ। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই বাস্তবতাই দেখা গেছে।
নদীর তীরের জনবসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও বাড়িঘর কাদায় চাপা পড়েছে, কোথাও রাস্তা ও সেতু নিশ্চিহ্ন হয়েছে, আবার কোথাও পুরো গ্রামই যেন নদীর স্রোতে হারিয়ে গেছে। উদ্ধারকারীদের বুকসমান কাদা ভেঙে জীবিতদের খোঁজার দৃশ্য মানবসভ্যতার অসহায়ত্বের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যে বাড়িতে কয়েক ঘণ্টা আগেও মানুষের স্বাভাবিক জীবন চলছিল, সেখানে এখন কেবল কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপ। আর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা। হাজারো পরিবারের কাছে এখন প্রতিটি মুহূর্ত অপেক্ষার।
কোনো নিখোঁজ মানুষ হয়তো উদ্ধার হবেন—এই আশায় স্বজনেরা তাকিয়ে আছেন উদ্ধারকারী দলের দিকে। কোথাও হয়তো বাবা অপেক্ষা করছেন সন্তানের জন্য, কোথাও সন্তান খুঁজছে বাবা-মাকে। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাই মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকগুলোর একটি হলো—প্রথম আঘাতের পরও বিপদ শেষ হয় না। হিমবাহ ধসের ঘটনায় উজানে ধ্বংসস্তূপ আটকে থাকলে সেখানে পানি জমে নতুন জলাধার তৈরি হতে পারে।
কোনো একপর্যায়ে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসস্তূপ একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। তখন প্রথম বন্যার চেয়েও বড় বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞদের নতুন করে বন্যার আশঙ্কা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। উজানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নদীর পানির উচ্চতা পরিমাপ, ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতিকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক সত্য হলো—বিপর্যয় মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি শুধু উদ্ধার নয়, বরং বিপর্যয়ের আগেই মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
হিমালয়ের মতো উচ্চ পর্বত অঞ্চলে হিমবাহের পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমবাহের দ্রুত গলন, হিমবাহ-হ্রদ সৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীরা ক্রমাগত সতর্ক করে আসছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পাহাড়ি অঞ্চলেও পড়ছে। হিমবাহের স্থিতিশীলতা কমে গেলে বড় বরফখণ্ড ভেঙে পড়া, হিমবাহ-হ্রদের পানি হঠাৎ নেমে আসা কিংবা পাহাড়ি ঢালে ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তবে প্রতিটি বন্যা বা হিমবাহ ধসকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্কতার দাবি রাখে।
কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পেছনে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা, হিমবাহের অবস্থা এবং নদীর গতিপ্রকৃতিসহ একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উষ্ণায়নের ফলে হিমালয় অঞ্চলের বরফ ও পানির ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অতএব এই বিপর্যয়কে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা দরকার। নেপাল ও তিব্বতের এই বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষণীয়।
হিমালয়ের বরফ গলে যে বিপুল পানি দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়, তার সঙ্গে বাংলাদেশের নদীগুলোর একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকা একটি আন্তঃসীমান্ত জলব্যবস্থার অংশ। ফলে উজানে বড় ধরনের বন্যা, অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক পানিপ্রবাহের ঘটনা ভাটির দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বন্যা, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাতের মুখোমুখি। তাই হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তনকে দূরের কোনো দেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে নদীভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করা প্রয়োজন। শুধু সীমান্তবর্তী নদীর পানির উচ্চতা নয়, উজানের বৃষ্টিপাত, হিমবাহের অবস্থা, হিমবাহ-হ্রদের পানি, ভূমিধস এবং আকস্মিক জলপ্রবাহের সম্ভাবনাকেও আঞ্চলিক দুর্যোগ সতর্কতার অংশ করতে হবে। হিমালয় কোনো একক দেশের সম্পদ নয়। এর পানি, পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির প্রভাব বিস্তৃত একটি অঞ্চলের ওপর পড়ে। তাই হিমালয়কেন্দ্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপাল, চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রথম প্রয়োজন তথ্য বিনিময়। উজানে কোথায় অতিবৃষ্টি হচ্ছে, কোথায় হিমবাহ অস্থিতিশীল, কোথায় ভূমিধস হয়েছে, কোথায় পানি আটকে আছে—এসব তথ্য দ্রুত ভাটির দেশগুলোকে জানাতে হবে। দ্বিতীয় প্রয়োজন সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। একটি পাহাড়ি নদীতে আকস্মিক বিপদ তৈরি হওয়ার পর সেই তথ্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভাটির জনপদে পৌঁছে দিতে পারলে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তৃতীয় প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ। হিমালয়ের হিমবাহগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, কোন হিমবাহ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোন নদীর গতিপথে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বেশি—এসব বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। চতুর্থত, সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। হেলিকপ্টার, ড্রোন, স্যাটেলাইটচিত্র, স্বয়ংক্রিয় পানির স্তর পরিমাপক এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এই বিপর্যয় আরেকটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে—ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর ও পাহাড়ি ঢালের কতটা কাছে মানুষকে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া উচিত? দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের কারণে মানুষ প্রায়ই নদীর তীর, পাহাড়ের পাদদেশ কিংবা ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। কিন্তু এসব এলাকার ঝুঁকি যদি বিজ্ঞানসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে নতুন বসতি স্থাপন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। মানুষকে বিকল্প আবাসন, নিরাপদ জমি, জীবিকার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দিতে হবে। কারণ নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সুযোগ না থাকলে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা ছেড়ে যাবে—এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে। কাদা শুকাবে। ধ্বংসস্তূপ সরানো হবে। সড়ক ও সেতু আবার নির্মাণ করা হবে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন কীভাবে পুনর্গঠিত হবে—সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। বাড়ি হারানো মানুষকে শুধু একটি তাঁবু দিয়ে পুনর্বাসিত করা যায় না। তাদের আয়-রোজগার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। পুনর্গঠনের সময় একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আবার অবকাঠামো তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে একই বিপর্যয় আবার ঘটতে পারে। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন হতে হবে ‘আগের মতো’ নয়, বরং ‘আরও নিরাপদভাবে’। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সহাবস্থানই পথ।
হিমালয়ের এই বিপর্যয় আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ধারণা যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে তা ততটাই ভঙ্গুর। পাহাড়ের ঢাল, নদীর গতিপথ, হিমবাহের স্বাভাবিক পরিবর্তন—সবকিছুরই নিজস্ব শক্তি রয়েছে। মানুষের কাজ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করা নয়; বরং প্রকৃতির আচরণ বুঝে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা। একটি নদীর তীরে শহর গড়ে তুলতে হলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বুঝতে হবে। পাহাড়ে সড়ক নির্মাণ করতে হলে ভূমিধসের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে হলে পরিবেশগত সক্ষমতা দেখতে হবে। আর হিমবাহ অঞ্চলে বসতি ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয় প্রতিবেশী একটি দেশের দুঃখজনক ঘটনা হলেও এর শিক্ষা সার্বজনীন। প্রকৃতি যখন সতর্ক করে, তখন তার ভাষা অনেক সময় নির্মম হয়। হিমবাহ ধসের সঙ্গে নেমে আসা কাদা হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে থেমে যাবে। উদ্ধার অভিযানও একসময় শেষ হবে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন ঘর উঠবে। কিন্তু যে প্রশ্নটি থেকে যাবে তা হলো—আমরা কি এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেব? জলবায়ু পরিবর্তন, পাহাড়ি দুর্যোগ, নদীর আকস্মিক প্রবাহ এবং আন্তঃসীমান্ত পানিব্যবস্থাপনা—এসবকে আর আলাদা আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার সময় নেই। এগুলো একই পরিবেশগত ব্যবস্থার পরস্পর সংযুক্ত অংশ।
আজ নেপালের নদীতীরে যে জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়েছে, আগামীকাল অন্য কোনো পাহাড়ি বা নদী অববাহিকায় একই বিপদ দেখা দিতে পারে। তাই দুর্যোগ ঘটার পর শোক প্রকাশের পাশাপাশি দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেওয়াই হতে হবে রাষ্ট্রগুলোর প্রধান দায়িত্ব। হিমালয়ের বরফ গলছে—এটি শুধু পাহাড়ের গল্প নয়। তার পানি, তার নদী, তার বন্যা এবং তার বিপর্যয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ। তাই এখন সময় হিমালয়ের কান্না শোনার। সময় নদীর ভাষা বোঝার। আর সময় এসেছে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে সংঘাত নয়, নিরাপদ সহাবস্থানের নতুন পথ তৈরি করার। কারণ একটি দুর্যোগ কখনো শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়—তার অভিঘাত সীমান্ত পেরিয়ে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে।