ভেবেছিলাম চুপ করে থাকব। চুপ করে থাকার মতো ভালো ব্যাপার কিছু নেই। চুপ করে থাকো, আর সুযোগ বুঝে ভিড়ে গা ঘষে নাও। যখন যাদের হাতে ক্ষমতা, তাদের আনুগত্য মেনে নিয়ে জো-হুজুরি করতে পারলেই জীবনটা বেশ সহজ হয়ে যায়।
কিন্তু রক্ত। বদরক্তই বলুন বরং। না হলে কেউ প্রশ্ন করে! আখের খুইয়ে প্রতিবাদ করতে যায়! বোকার দল সব। আমার তের বছর দশ মাস বয়সী ছেলেটি জেন জি। সে এই বয়সেই যথেষ্ট রাজনীতি সচেতন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বলে, 'মাম্মা জানো, সবাই প্রোটেস্টকে সাপোর্ট করছে।' আমি জিজ্ঞাসা করি, 'তোরা কি স্কুলে লেখাপড়া ছেড়ে এসব নিয়েই আলোচনা করিস?' ও বলে, 'আমি কেন, সবাই করে।'
আশ্বস্ত হই। নিটে দ্বিতীয় স্থানাধিকারির বক্তব্য শুনে যে ভয়টুকু পেয়েছিলাম, সেটা কেটে যায়। ছেলেদের বাবাকে একান্তে জিজ্ঞাসা করি, 'যদি তোমার ছেলে যন্তর মন্তরে প্রোটেস্ট করতে যায়, তুমি অ্যালাউ করবে?' সে বলে, 'আমি গর্ববোধ করব।' আমি বলেছিলাম, 'আমি যাই তবে?' যেদিন রাত দখলের রাতে রাত একটায় একা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম, সে জানতে চায়নি কখন ফিরব। কালও বলল, 'কবে যাবে? টিকিট কেটে দিচ্ছি। ঘরে বসে ছটফট করার চেয়ে যাও, ঘুরে এসো।'
যাওয়া হয়নি। শরীর ঠিক নেই। মনটা পড়ে আছে ওদের সঙ্গে। আমেরিকা, চিন, নেপাল, বাংলাদেশ, সোরোস, ডিপ স্টেট, আজাদি স্লোগান সব নিয়ে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া ও আইটি সেলের দুর্বল লড়াইটুকু দেখছি। রাষ্ট ও দেশকে গুলিয়ে দেওয়ার হাস্যকর চেষ্টা দেখে আশ্চর্য হচ্ছি না। কারণ সারা পৃথিবী জুড়ে স্বৈরাচারীরা অনন্তকাল ধরে এই কাজটাই করে এসেছে। ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আনুগত্য আর দেশপ্রেম এক নয়। কোনওদিন ছিল না।
দেশকে ভালোবাসি বলেই প্রশ্ন করার অধিকার আমার আছে। সে যে দলের সরকারই হোক, বিজেপি, কংগ্রেস, বাম ফ্রন্ট, আপ, যেই কাল-পরশু-তরশু আসুক ক্ষমতায়, বেচাল দেখলে তাদের প্রত্যেককে প্রশ্ন করার অধিকার আমাকে আমার সংবিধান দিয়েছে। কোনও দলের প্রতি মোহ নেই আমার। থাকবেও না। আমার বন্ধুবৃত্তে যারা জেন জি আছে, তাদের ভারী ভালোবাসি। ওরা ভন্ডামি জানে না। সোজা কথা সোজা করে বলে।
আর রইল আমার কথা। ছেলেদের বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘ধরো যদি প্রতিবাদ করার জন্য কখনও জেলে যেতে হয়, কী করবে?’ সে বলল, 'ভালো লেখক হতে হলে সব কিছুর অভিজ্ঞতা থাকা ভালো। ছেলেদের আমি সামলে নেব। চিন্তা কোরো না।'
বাকি রইল, আমার নিজের স্বার্থটুকুর কথা। আমার বাড়িতে গাদা গাদা ট্রফি পড়ে আছে আলমারির মাথায়। আমার ও ছেলেদের অর্জন। ধুলো পড়েছে। রঙ চটে একশা। কারও মায়া বা মোহ কোনোটাই নেই। তাই যখন কিছুই পাওয়ার নেই, তাহলে চাটুকারিতা করব কীসের জন্য! কিছু পাঠক আছেন, যারা আমার লেখা ভালোবেসে পড়েন। আর আছে আমার পরিবার, স্টিলের পিলারের মতো শক্ত সাপোর্ট সিস্টেম। আর কী চাই! তাই কী রইল, কী গেল, সে নিয়ে ভাবছি না আর। ভাববও না। ছাত্রদের সঙ্গে আছি। ছিলাম। থাকব শেষ পর্যন্ত।




