শরতের উৎসবে মেতে উঠেছে বাংলা। শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে। তবে উত্তর ২৪ পরগনার ইছাপুর নবাবগঞ্জের মণ্ডল বাড়ির দুর্গোৎসবের পরিচিতি একটু আলাদা। কারণ, এখানে দেবী দুর্গা পূজিত হন না প্রচলিত দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। বরং মহাদেবের কোলেই গৌরী রূপেই আরাধনা করা হয় দেবীর। ২১৮ বছরে পা দিয়েছে এই বনেদি বাড়ির পুজো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুরনো রীতিনীতি মেনেই চলছে দেবীর আরাধনা।
রথযাত্রার দিন থেকে শুরু হয়ে যায় একচালার প্রতিমা তৈরির কাজ। মহালয়ার দিন থেকেই পুজোর প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়। এরপর প্রতিদিন নিয়ম মেনে চলে নিত্যপুজো। জানা গিয়েছে, পরিবারের পূর্বপুরুষ শ্রীধর ও বংশীধরের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। প্রথম দিকে প্রতিমার পরিবর্তে ঘট প্রতিষ্ঠা করেই পুজো করা হত। পরে স্বপ্নাদেশের সূত্র ধরে হরগৌরী রূপে দেবীর আরাধনা শুরু হয় বলে পারিবারিক বিশ্বাস। এই প্রতিমায় দেবীর দশটি হাত নেই, নেই মহিষাসুর বধের দৃশ্যও। দেবীর সঙ্গেই থাকেন মহাদেব এবং চার সন্তান। বৈষ্ণবীয় রীতি মেনেই সম্পন্ন হয় পুজোর সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান।
নতুন বাঁশের কাঠামো পুজো করে তার উপর খড় বাঁধার মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণ। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হলে আঁকা হয় চালচিত্র। ষষ্ঠীর সকাল পর্যন্ত ঘটপুজোর পর্ব চলবে। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় হরগৌরী রূপে সজ্জিত প্রতিমার সামনে ঘট এনে শুরু হয় মূল পুজো। সেই পুজো চলবে দশমী পর্যন্ত। ঐতিহ্য মেনে প্রতিমার দু’পাশে জ্বালানো হয় একটি ঘিয়ের প্রদীপ ও একটি তেলের প্রদীপ, যা দশমীর সকাল পর্যন্ত জ্বলতে থাকে।সময় বদলেছে, অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু এই পুরনো আচারগুলো এখনও চলছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে মায়ের দর্শনে।
এই পুজোর ভোগেও রয়েছে বিশেষত্ব। দেবীকে নিবেদন করা হয় লুচি, সুজি, ফল, মিষ্টি-সহ বিভিন্ন নিরামিষ পদ। পুজোর দিনগুলিতে কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা পরিবারের সদস্যরা এক ছাদের তলায় মিলিত হন। পুরনো স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং ঐতিহ্যকে ঘিরে উৎসবের আবহ তৈরি হয় বাড়িতে। মণ্ডল বাড়ির দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বিসর্জনের রীতি। দশমীতে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নিজেদের কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যান গঙ্গার ঘাটে। সেখানে নৌকায় করে দেবীকে গঙ্গাবক্ষে প্রদক্ষিণ করানোর পর সম্পন্ন হয় বিসর্জন। এই পুজো শুধু দেবী আরাধনার উৎসব নয়, মণ্ডল পরিবারের বিশ্বাস আর সংস্কারকে প্রতি বছর নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার গল্প।
