আসানসোল: একশো বছরেরও বেশি পুরনো কারখানা। দীর্ঘ শিল্প-ইতিহাসের সাক্ষী বার্নপুরের ইস্কো। কিন্তু এত বছরেও শ্রমিক সংগঠনের স্বীকৃতি নির্ধারণে হয়নি ভোট। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘ আইনি জট কাটিয়ে সেই ইতিহাসে যোগ হল নতুন অধ্যায়। প্রথম বার শ্রমিক সংগঠন বেছে নিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট হল সেলের বার্নপুর ইস্কো স্টিল প্ল্যান্টে। আর ফল প্রকাশ হতেই মধ্যরাতে আবিরে রঙিন হল শিল্পশহর। প্রথম নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেল ভারতীয় মজদুর সংঘ (বিএমএস)-সমর্থিত বার্নপুর ইস্পাত কর্মচারী সংঘ।
1918 সালে পথচলা শুরু ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি বা ইস্কোর। বাঙালি শিল্পোদ্যোগী স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কারখানা পরে তাঁর উত্তরসূরি স্যার বীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এগিয়ে যায়। আসানসোল-বার্নপুর শিল্পাঞ্চলের শিল্প-পরিচয়ের সঙ্গে ইস্কোর নাম ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্তকরণের পর কারখানাটি সেলের অন্তর্ভুক্ত হয়। নানা ওঠাপড়া পেরিয়ে আধুনিকীকরণের পথে ফের ঘুরে দাঁড়ায় ইস্কো।
2006 সালে সেলের অধীনে আসার পর কারখানার পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া আরও গতি পায়। 2015 সালে প্রায় 17 হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকীকরণ প্রকল্পের কাজ হয়। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে। বর্তমানে আরও বড় পরিসরে আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। প্রায় 35 হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের এই প্রকল্প শেষ হলে ইস্কো এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আধুনিক ইস্পাত কারখানায় পরিণত হবে বলে কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে। তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও।
কিন্তু কারখানার এই দীর্ঘ যাত্রায় শ্রমিক সংগঠনের নির্বাচন এত দিন হয়নি বলেই দাবি বিভিন্ন সংগঠনের। বিরোধী শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে INTUC-এর প্রভাব ছিল ইস্কোয়। CITU-ও সক্রিয় ছিল। অন্য সংগঠনগুলির দাবি, তাঁদের সংগঠন বিস্তারের সুযোগ সীমিত ছিল। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলির বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এর মধ্যেই কেন্দ্রের ‘এক শিল্প, এক সংগঠন’ নীতিকে ঘিরে স্বীকৃত শ্রমিক সংগঠন বাছাইয়ের প্রশ্ন সামনে আসে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের ভোটে একটি সংগঠনকে স্বীকৃতি দিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের হয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইস্কোতেও সেই প্রক্রিয়া শুরু করতে গিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে এবং কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রকের উদ্যোগে ভোটের রাস্তা খুলে যায়। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। কারখানার স্থায়ী কর্মী মিলিয়ে মোট ভোটার ছিলেন 3514 জন। ভোট পড়ে 3291টি। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, একতরফা ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বিএমএস-সমর্থিত বার্নপুর ইস্পাত কর্মচারী সংঘ। তারা পেয়েছে 2189 ভোট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা INTUC-সমর্থিত আসানসোল আয়রন অ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের প্রাপ্ত ভোট 781। CITU-সমর্থিত আসানসোল বার্নপুর-কুলটি মেটাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন পেয়েছে 215 ভোট। HMS-সমর্থিত সংগঠনের ঝুলিতে 31 ভোট। AITUC-র একটি সংগঠন পেয়েছে 33 ভোট।
ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বার্নপুরে বদলে যায় রাতের ছবি। আবির হাতে রাস্তায় নেমে পড়েন বিএমএস সমর্থক শ্রমিকেরা। একে অপরকে রাঙিয়ে শুরু হয় উচ্ছ্বাস। কারও হাতে আবির, কোথাও বাজছে ঢাক-ঢোল। মধ্যরাতে শিল্পশহরে যেন অকাল হোলি। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরে প্রথম বার নিজেদের ভোটে একটি শ্রমিক সংগঠনকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আনন্দেই এই উচ্ছ্বাস বলে দাবি বিজয়ী সংগঠনের।
বিএমএস নেতৃত্বের আরও দাবি, ভোটের ফল শ্রমিকদের মনোভাবেরই প্রতিফলন। সংগঠনের নেতা সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মহেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর এই জয় এসেছে। তাঁদের দাবি, শ্রমিকরা তাঁদের পাশে রয়েছেন, ভোটের ফলেই তার প্রমাণ মিলেছে।
রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও বিএমএসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এত দিন শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা তোলার অভিযোগ ছিল এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতে দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, এ বার শ্রমিকেরা নিজেদের সংগঠন বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এবং শ্রমিকস্বার্থে বিএমএস কাজ করবে।
বার্নপুরের বিজেপি নেতা তথা রাজ্য কমিটির সদস্য পবন সিংয়ের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন নিয়ে জটিলতা ছিল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়ালের সঙ্গে যোগাযোগের পর বিষয়টি এগোয় বলে তাঁর বক্তব্য। আদালতের নির্দেশের পর শেষ পর্যন্ত ভোট সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে এই ভোট শুধু একটি শ্রমিক সংগঠনের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়। 1918 সালে যাত্রা শুরু করা ইস্কোর ইতিহাসে এই প্রথম শ্রমিকদের ভোটে একটি সংগঠন স্বীকৃতি পেল। ফলে শতবর্ষ পেরিয়ে ইস্কোর শ্রমিক রাজনীতিতেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। এখন আসল পরীক্ষা অন্য জায়গায়—ভোটে পাওয়া এই বিপুল সমর্থনকে শ্রমিকদের দৈনন্দিন সমস্যা, বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য দাবিদাওয়ার ক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগাতে পারে বিএমএস। রাতের আবিরের রং ফিকে হওয়ার পর সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজবে বার্নপুর।
