কলকাতা: ভারতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আইআইটি-র নাম মানেই স্বপ্নপূরণ। লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার কাছে এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং সফল ভবিষ্যতের প্রতীক। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন আইআইটি (বিএইচইউ)-এর এক প্রাক্তনী। তাঁর একটি সমাজমাধ্যম পোস্ট এখন ভাইরাল। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘চার বছরের ডিগ্রি যেন তোমার পরবর্তী চল্লিশ বছরের জীবন ও পরিচয় নির্ধারণ না করে।’ এই একটি বাক্য ঘিরেই শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
প্রাক্তন ছাত্র আকাশ সম্পূর্ণানন্দ পাণ্ডে নিজের কলেজজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, তিনি কখনও তথাকথিত ‘আদর্শ ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র’ ছিলেন না। ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও পাঠ্যবইয়ের চেয়ে তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সাহিত্য পড়ায়। বন্ধুরা যখন প্লেসমেন্টের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন লাইব্রেরিতে অন্য বিষয়ের বই পড়ে। পরীক্ষার আগে প্রয়োজনমতো পড়াশোনা করে পাশ করলেও, তাঁর প্রকৃত আগ্রহ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে।
পাণ্ডের বক্তব্য, আইআইটির ডিগ্রি তাঁকে প্রথম সুযোগ করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জীবনের আসল শিক্ষা তিনি পেয়েছেন শ্রেণিকক্ষের বাইরের অভিজ্ঞতা থেকে। কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর তিনি বুঝতে পারেন, শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জ্ঞান নয়, বরং বহুমুখী চিন্তাভাবনা, যোগাযোগের দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং নতুন বিষয় শেখার আগ্রহই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তরুণদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়েছেন— ডিগ্রিকে সম্মান করুন, কিন্তু তাকে নিজের পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি বানাবেন না।
এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে শুরু হয় বিস্তর বিতর্ক। অনেকেই তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করে লিখেছেন, বর্তমান যুগে কেরিয়ারের সংজ্ঞা বদলে গিয়েছে। একজন ইঞ্জিনিয়ার সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, লেখক, নীতিনির্ধারণ বিশেষজ্ঞ বা শিল্পী— যে কোনও পেশায় সফল হতে পারেন। ডিগ্রি কেবল একটি দরজা খুলে দেয়, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কোন পথে হাঁটবেন, তা নির্ভর করে ব্যক্তির আগ্রহ, দক্ষতা এবং নিরন্তর শেখার মানসিকতার উপর।
তবে সমালোচকদের বক্তব্যও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের প্রশ্ন, দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে আইআইটিতে পড়ার স্বপ্ন দেখেন। এমন একটি মূল্যবান সুযোগ পেয়েও যদি কেউ নিজের বিষয়কে গুরুত্ব না দেন, তবে সেটি কি সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি সুবিচার? অনেকের মতে, ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে তুলে ধরা ঠিক নয়, কারণ প্রত্যেকের বাস্তবতা এবং সুযোগ এক নয়।
তবে এই বিতর্কের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধুই একটি চাকরি পাওয়া, নাকি নিজের প্রকৃত আগ্রহ ও সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করা? বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বর্তমান কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণ এবং বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ডিগ্রি যতই মূল্যবান হোক, জীবনের সাফল্য নির্ধারণ করে শেষ পর্যন্ত মানুষের কৌতূহল, অভিযোজন ক্ষমতা এবং নিরন্তর শেখার ইচ্ছাই।
একটি সাধারণ সমাজমাধ্যম পোস্ট তাই এখন অনেক বড় আলোচনার সূত্রপাত করেছে। আইআইটির ডিগ্রির মূল্য নিয়ে নয়, বরং ডিগ্রির গণ্ডি পেরিয়ে নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করার সাহস নিয়েই এখন সরব নেটদুনিয়া। আর সেই কারণেই আকাশ পাণ্ডের বক্তব্য নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে— সনদ জীবনের শুরু হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের সীমারেখা নয়।