কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ার ঘটনায় নয়া মোড়। শুক্রবার রাতে ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিনুর শেখকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। এরই প্রতিবাদে কলকাতা পুরসভার ‘বিল্ডিং’ দফতরের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারেরা পুরসভার ডিজি (বিল্ডিং) উজ্জ্বল সরকারের ঘরের সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। তাঁদের একটাই দাবি, আমিনুরকে ফাঁসানো হয়েছে।
পুর-ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি, তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনায় আমিনুর কোনও ভাবেই যুক্ত নন। অবিলম্বে তাঁকে ছাড়া না হলে পুর-ইঞ্জিনিয়াররা বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছেন। তাঁরা জানাচ্ছেন, আমিনুরের জামিন না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কোনও কাজ করবেন না। প্রয়োজনের কাজ বন্ধ করে চলবে প্রতিবাদ কর্মসূচিও।
গত ২৪ জুন তারাতলায় একটি গুদামের নির্মীয়মাণ কাঠামো আচমকাই ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বিশাল লোহার কাঠামো ও কংক্রিটের স্তূপের নিচে চাপা পড়েন অন্তত ৪০ জন শ্রমিক। খবর পেয়ে পুলিশ, দমকল এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী উদ্ধারকাজ শুরু করে। পরে রাজ্য সরকারের অনুরোধে ভারতীয় সেনা ও এনডিআরএফ-ও অভিযানে যোগ দেয়। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৬ জনের। ঘটনার পরই নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি থেকে শুরু করে কলকাতা পুরনিগমের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে লালবাজার।
সেদিনই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। পরে বিধানসভায় জানিয়েছিলেন, ওই গুদামের অনুমোদনপত্রে সই ছিল খোদ ফিরহাদের। তৃণমূল আমলে ওই নির্মীয়মাণ গুদামের নকশার অনুমোদন করেছিল কলকাতা পুরসভা। সেই সূত্র ধরেই পুরসভার ভূমিকাও খতিয়ে দেখে পুলিশ।
তারপরেই তদন্তকারীদের নজরে আসে, তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ গুদামের জন্য কলকাতা পুরনিগমের অনুমোদন ছিল। সেই তদন্তেই উঠে আসে গুদামটির নকশা, নির্মাণের অনুমোদন এবং নির্মাণের সময় নিয়ম মেনে কাজ করা হয়েছিল কি না, সেই সমস্ত একাধিক প্রশ্ন।
এর আগে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে এক জন ওই গুদামের সুপারভাইজ়ার। এছাড়া, দু'জন গুদামে কাজ করার জন্য শ্রমিক সরবরাহ করতেন। ফিরহাদ ঘনিষ্ঠ কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করা হয়েছে। কলকাতা পুরসভা সূত্রে খবর, ফিরহাদ হাকিম মেয়র হওয়ার পর OSD হিসেবে তাঁর কাজ সামলাতেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর হাতে ছিল সব ক্ষমতা। মেয়রের কাছে পৌঁছতে গেলে 'কালীবাবু' হয়েই যেতে হত সবাইকে। এবার আমিনুর শেখকে গ্রেফতার করা হল।
আমিনুর শেখের গ্রেফতারিকে ঘিরে পুরসভার অন্দরে ইতিমধ্যেই চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারী ইঞ্জিনিয়ারদের বক্তব্য, নির্মাণকাজের অনুমোদন ও তদারকির ক্ষেত্রে কোনও আধিকারিকের দায়িত্ব ঠিক কোথায়, তা স্পষ্ট ভাবে খতিয়ে না দেখে এক জন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে গ্রেফতার করা ঠিক নয়। তাঁদের দাবি, তদন্তে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা হোক এবং আমিনুরকে অযথা হয়রানি করা বন্ধ করা হোক। অন্য দিকে, পুলিশ সূত্রে দাবি, তদন্তের স্বার্থেই আমিনুরকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং নির্মাণকাজের অনুমোদন, দায়িত্ব বণ্টন ও নিয়ম মেনে কাজ হয়েছিল কি না,সমস্ত বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আমিনুরের গ্রেফতারির পর তারাতলার ওই দুর্ঘটনা নিয়ে তদন্ত আরও কোন দিকে গড়ায়, এখন সেটাই দেখার। নির্মাণকাজে অনুমোদিত নকশা মেনে কাজ হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দায়িত্ব কতটা ছিল এবং নিরাপত্তা বিধি যথাযথ ভাবে মানা হয়েছিল কি না,এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে পুর-ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মবিরতির হুমকিতে পুরসভার দৈনন্দিন পরিষেবাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে এক দিকে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং অন্য দিকে পুর-ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটানো,দুই দিকেই কলকাতা পুরসভা ও প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে।




