নিউজ ডেস্ক: তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের আলোয় আবার সংস্কৃত ও ল্যাটিন। আদি উৎস ‘প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয়’ ভাষার সন্ধানে। ভাষাবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা ও গবেষণায় সংস্কৃত এবং ল্যাটিন ভাষার মধ্যে এক গভীর কাঠামোগত ও শব্দভাণ্ডারগত ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরায় প্রমাণিত হয়েছে। সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র ধরে গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন যে, এই দুটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষার উৎস আসলে একটিই—যাকে বলা হয় ‘প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয়’ (Proto-Indo-European) বা মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা।
এই ভাষাগত সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো, বিজ্ঞানী ও ভাষাবিদদের মতে, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও সংস্কৃত এবং ল্যাটিন ভাষার ব্যাকরণ ও শব্দ গঠনে যে অভূতপূর্ব মিল রয়েছে, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এছড়াও রয়েছে শব্দভাণ্ডারের মিল (Lexical Similarities)। পারিবারিক সম্পর্ক, সংখ্যা এবং প্রকৃতির মৌলিক উপাদানবাচক শব্দগুলোতে এই দুই ভাষার সাদৃশ্য স্পষ্ট।
যেমন:
সংস্কৃতের 'মাতৃ' (Mātṛ) ল্যাটিনে রূপ নিয়েছে 'মাSettings' (Mater)-এ।
সংস্কৃতের 'পিতৃ' (Pitṛ) ল্যাটিনে হয়েছে 'প্যাতের' (Pater)।
সংস্কৃতের 'ভ্রাতৃ' (Bhrātṛ) ল্যাটিনে হয়েছে 'ফ্রেতের' (Frater)।
সংখ্যার ক্ষেত্রে সংস্কৃতের 'ত্রয়ঃ' ল্যাটিনে 'ত্রেস' (Tres) এবং 'সপ্ত' ল্যাটিনে 'সেপ্তেম' (Septem) হিসেবে দেখা যায়।
কাঠামোগত ও ব্যাকরণগত মিল(Structural Affinity) ও রয়েছে উভয় ভাষাতেই। উভয় ভাষাই অত্যন্ত জটিল এবং বিভক্তিপ্রধান। ক্রিয়াপদের রূপান্তর, কারক বিকার এবং বচনের ব্যবহারে এই দুই ভাষার গঠনে এক অদ্ভুত সমান্তরাল ধারা লক্ষ করা যায়।
ধ্বনি পরিবর্তনের সুশৃঙ্খল নিয়মও এর পিছনের একটি বড় কারণ। তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এটি প্রমাণ করা যে, এই ভাষারূপগুলো এলোমেলোভাবে পরিবর্তিত হয়নি। গ্রিম-এর সূত্র এবং ভের্নার-এর সূত্রের মতো সুনির্দিষ্ট ধ্বনিবিজ্ঞানগত নিয়মের মাধ্যমে মূল প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে কীভাবে সংস্কৃত এবং ল্যাটিনে শব্দগুলো বিবর্তিত হয়েছে, তা গাণিতিক নিখুঁততায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, আদি ভাষার নির্দিষ্ট কিছু স্পর্শধ্বনি ল্যাটিনে উষ্মধ্বনিতে রূপান্তরিত হলেও সংস্কৃতে তা ভিন্ন নিয়মে সংরক্ষিত হয়েছে।
পুনর্নির্মিত হলো ইতিহাস ও সভ্যতা। এই ভাষাতাত্ত্বিক আবিষ্কার কেবল ভাষার ইতিহাসকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং প্রাগৈতিহাসিক মানব অভিবাসনের ইতিহাসকেও উন্মোচিত করেছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, এশিয়া ও ইউরোপের একটি বিশাল অংশের মানুষের পূর্বপুরুষেরা একসময় একই অঞ্চলে বসবাস করতেন এবং একই ভাষায় কথা বলতেন। কালের বিবর্তনে ও ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাটি ভেঙে গিয়ে সংস্কৃত, ল্যাটিন, গ্রিক এবং আধুনিক যুগের বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ও পার্সির মতো অসংখ্য ভাষার জন্ম দিয়েছে।
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, সংস্কৃত ও ল্যাটিনের এই নিবিড় যোগসূত্র বিশ্ব সভ্যতার অভিন্ন শিকড়কে চেনার এবং মানবজাতির সাংস্কৃতিক ঐক্যের ইতিহাসকে বোঝার ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক।




