ঢাকা, হাবিবুর রহমান: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আরও দ্রুত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে যেকোনও সমস্যা সমাধানের বিষয়েও আশাবাদ পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। ভারতীয় হাইকমিশনারের এ বক্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মধ্যে তারেকের ভারত সফর নিয়ে ফের দোটানার সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ১০ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী।
রবিবার রাতে রাজধানীর বারিধারায় বাংলাদেশে আয়ারল্যান্ডের অনারারি কনসাল মাসুদ জামিল খান ও তাঁর স্ত্রী কেট জারো খানের আয়োজিত এক নৈশভোজে স্বাগত বক্তব্যে ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, বাংলাদেশ ও ভারত শুধু একটি সীমান্তই ভাগাভাগি করে না, তারা ‘বাস্তবে এক অভিন্ন স্বপ্নও ভাগাভাগি করে নেয়।’ দীনেশ ত্রিবেদী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদও ব্যক্ত করেন। নৈশভোজে বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিকদের পাশাপাশি বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে তারেক রহমানের ভারত সফরে তিন শর্তের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত বিদেশসচিব এ কে এম শহিদুল করিম। রবিবার ঢাকায় তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে দিল্লিকে বার্তা দিয়েছে ঢাকা। সেখানে তিন শর্তের কথা বলা হয়েছে।
শহিদুল বলেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের আধিকারিকরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে একটি দ্বিপাক্ষিক সফরের সম্ভাবনা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তবে সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য মতবিনিময়ের ফলে এই প্রক্রিয়াটি বিঘ্নিত হয়েছে, যিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে এ সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়া, ওসমান হাদির হত্যায় অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণ এবং অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করলেই প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন।
আয়ারল্যান্ডের কনসাল মাসুদ জামিল খানের দেওয়া নৈশভোজে দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে তাঁর মন্তব্য। তিনি মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে যে কোনও জটিলতা আলোচনার টেবিলে বসেই মেটানো সম্ভব। তাঁর কথায়, বৈঠকের মাধ্যমেই সমস্যাগুলির সমাধান করা যায় এবং এই প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী।
দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বৈঠকের মাধ্যমেই কেবল সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব এবং আমি অত্যন্ত আশাবাদী।’ তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মানুষের হৃদয় খুব কাছাকাছি এবং তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি ‘সোনালি অধ্যায়’ দেখতে চান। ভারতীয় দূত বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত দুটি সার্বভৌম দেশ।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে। এতে কোনও সন্দেহ নেই। আর যদি কোনও চ্যালেঞ্জ না থাকে, তাহলে সেটি গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র যতই বিশৃঙ্খল হোক না কেন...’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নিজেদের জায়গা প্রয়োজন। আমাদের মতপার্থক্য আছে। আমাদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সেটি ঠিক আছে। কিন্তু যতক্ষণ আমাদের লক্ষ্য একই থাকে, অর্থাৎ আমরা চাই শুধু এই দুই দেশের মানুষ নয়, সারা বিশ্বের মানুষ মর্যাদা, সম্মান এবং একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিয়ে বেঁচে থাকুক। আর আমরা সেটিই অর্জনের চেষ্টা করছি। আমি আন্তরিকভাবে চাই...... আমার মূল লক্ষ্য হলো ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সোনালি সময় প্রতিষ্ঠা করা।’
হাইকমিশনার বলেন, ‘আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সত্যিকার অর্থেই ‘জনগণের নেতা’ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একইভাবে জনগণের নেতা। তিনি বলেন, ‘দুজনই জনগণের নেতা এবং তাঁদের উদ্দেশ্যও একই। আর এ কারণেই আমি বহুবার গণমাধ্যমে, যেখানে আমাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, বলেছি যে এমন দুই নেতা যখন একসঙ্গে বসেন এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন এমন কোনও সমস্যা বা ইস্যু নেই, যা আলোচনা করা যায় না এবং যার সমাধান করা যায় না।’
এর আগে, গত শনিবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়া এবং বাংলাদেশ-ভারতের ব্যতিক্রমী বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও লালন করতে একসঙ্গে কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।