ইতালি: পিৎজার উপর আনারস! কারও কাছে অতি পছন্দের খাবার, আবার কারও কাছে রীতিমতো অপরাধ। বিশেষ করে ইতালীয়দের একাংশের কাছে পিৎজায় আনারস দেওয়ার বিষয়টি রন্ধনশৈলীর ঐতিহ্যের পরিপন্থী। কিন্তু সেই আপত্তি জানাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত চাকরিই খোয়াতে হল এক ইতালীয় শেফকে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের একটি রেস্তরাঁয় কাজ করতেন ডাভিদে তাম্বুরেল্লা। গ্রাহকের অনুরোধে হ্যাম ও আনারস দিয়ে পিৎজা তৈরি করতে অস্বীকার করেছিলেন তিনি। তাঁর যুক্তি, পিৎজায় আনারস দেওয়া ইতালীয় সংস্কৃতির প্রতি অপমান।
আর সেই সিদ্ধান্তের জেরেই চাকরি হারাতে হয় তাঁকে। পরে অন্যায় ভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার অভিযোগ তুলে অস্ট্রেলিয়ার ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশনের দ্বারস্থ হলেও সেখানেও স্বস্তি মেলেনি তাঁর। ঘটনাটি ব্রিসবেনের ‘লা কোস্তা’ রেস্তরাঁর। ইতালীয় খাবারের জন্য পরিচিত এই রেস্তরাঁয় কাজ করতেন তাম্বুরেল্লা। চলতি বছরের মে মাসে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধের অন্যতম কারণ ছিল পিৎজায় আনারস ব্যবহার করতে অস্বীকার করা। কমিশনের শুনানিতে উঠে এসেছে, গত চার বছরে অন্তত তিন বার এই নির্দেশ মানতে চাননি ওই শেফ।
১৫ হাজার ডলারের অনুষ্ঠান, তবু বদলাননি সিদ্ধান্ত
বিতর্কের সূত্রপাত একটি বড় অনুষ্ঠানের খাবারের আয়োজন ঘিরে। রেস্তরাঁর মালিক এলিয়ট ইনগ্রামের দাবি, ওই অনুষ্ঠানের আয়োজনে ১৫ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলারেরও বেশি খরচ করছিলেন এক গ্রাহক। তাঁর বিশেষ অনুরোধ ছিল, অতিথিদের জন্য হ্যাম ও আনারস দেওয়া পিৎজা তৈরি করতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশ মানতে রাজি হননি তাম্বুরেল্লা।
রেস্তরাঁর মালিকের বক্তব্য, এটি প্রথম ঘটনা ছিল না। এর আগেও দু’বার একই ধরনের নির্দেশ অমান্য করেছিলেন ওই শেফ। তৃতীয় বারও নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইতালীয় সংস্কৃতির পক্ষে অপমানজনক কোনও কাজ করতে তাঁকে বাধ্য করা যায় না। এমনকি রেস্তরাঁর কর্তৃপক্ষকে ইতালীয়দের কাছে পিৎজায় আনারস না দেওয়ার গুরুত্ব কতটা, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শও দিয়েছিলেন তিনি।
ইনগ্রামের অবশ্য বক্তব্য, ব্যক্তিগত ভাবে তাঁরও পিৎজায় আনারস বিশেষ পছন্দ নয়। কিন্তু রেস্তরাঁ চালানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকের পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হয়। তাঁর কথায়, দীর্ঘ ১৭ বছর আতিথেয়তা শিল্পে কাজ করেছেন তিনি। প্রায় ১০ বছর রেস্তরাঁ পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন, কোন বিষয়ে আপস করা উচিত আর কোন বিষয়ে নয়। গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করাও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শুধু আনারস নয়, উঠেছিল আরও অভিযোগ
তবে তাম্বুরেল্লার দাবি, শুধুমাত্র পিৎজায় আনারস দিতে অস্বীকার করার জন্যই তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার ঘটনাও বরখাস্তের সিদ্ধান্তের পিছনে ভূমিকা রেখেছিল। গত এপ্রিল মাসে কাজের জায়গায় একটি ধাতব রেলিংয়ে আঘাত করার ফলে তাঁর ডান হাতের দু’টি হাড় ভেঙে যায়।
অন্য দিকে, রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, কর্মক্ষেত্রে তাঁর আচরণ নিয়েও একাধিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। অনুপযুক্ত ভাষার ব্যবহার, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন এবং কাজের সময় উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলার মতো অভিযোগও উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। মে মাসে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার প্রায় দু'সপ্তাহ আগে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর একটি বৈঠক হয়েছিল। সেখানেও এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়।
কমিশনে গিয়েও লাভ হল না
চাকরি হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশনে অভিযোগ জানান তাম্বুরেল্লা। তাঁর দাবি ছিল, অস্ট্রেলিয়ার ফেয়ার ওয়ার্ক আইন লঙ্ঘন করে তাঁকে চাকরি থেকে সরানো হয়েছে। কিন্তু কমিশনার জেনিফার হান্ট তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কমিশন পিৎজায় আনারস দেওয়া উচিত কি না, কিংবা শেফের সাংস্কৃতিক আপত্তি যুক্তিসঙ্গত কি না, সেই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেনি। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরে অভিযোগ জমা দেওয়াই আবেদন খারিজের প্রধান কারণ। কমিশনের পর্যবেক্ষণ, আবেদনটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা পড়েনি।
এমন পরিস্থিতিকে ব্যতিক্রমী কারণ হিসেবে বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট যুক্তিও পাওয়া যায়নি। চাকরি হারানোর ফলে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য নিয়োগকর্তার মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াতেও ধাক্কা খেয়েছিলেন তাম্বুরেল্লা। কারণ, তাঁকে স্পনসর করার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় পুরনো রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষ।
আনারসের রাজ্যেই আনারস নিয়ে বিতর্ক!
ঘটনার সবচেয়ে মজার দিক, যে রাজ্যে এই বিতর্কের সূত্রপাত, সেই কুইন্সল্যান্ডই অস্ট্রেলিয়ার আনারস উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত প্রায় সমস্ত আনারসই এই রাজ্য থেকে আসে। ফলে আনারসের জন্য পরিচিত রাজ্যেই পিৎজ়ায় আনারস ব্যবহার নিয়ে এমন বিতর্ক যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
ইতিমধ্যে অবশ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে ‘লা কোস্তা’ রেস্তরাঁ। জুলাই মাসে লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ব্যবসা গুটিয়ে নেয় কর্তৃপক্ষ। অন্য একটি ইতালীয় রেস্তরাঁয় নতুন কাজ পেয়েছেন তাম্বুরেল্লা। মজার বিষয়, সেই রেস্তরাঁর খাবারের তালিকাতেও নেই আনারস দেওয়া পিৎজা।
পিৎজায় আনারস থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক নতুন নয়। ইতালীয় খাদ্যসংস্কৃতির বিশুদ্ধতা রক্ষার প্রশ্নে অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। আবার অনেকে মিষ্টি আনারসের সঙ্গে চিজ ও হ্যামের স্বাদের মিশেল বেশ উপভোগ করেন। কিন্তু একটি খাবারের উপকরণ নিয়ে মতের অমিল যে কর্মক্ষেত্রের বিতর্ক, চাকরি হারানো এবং শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই পর্যন্ত গড়াতে পারে, তা দেখিয়ে দিল অস্ট্রেলিয়ার এই ঘটনা।




