নিউজ ডেস্ক: প্রয়াত হলেন প্রখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। দীর্ঘ ১৪ মাস ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত থাকার পর অবশেষে ৮৭ বছর বয়সে থেমে গেল এই কিংবদন্তি শিল্পীর তুলির টান। কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে শোকের ছায়া নেমে আসে।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আবির্ভূত এই প্রখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পীর জন্ম অবিভক্ত বাংলায়। তিনি ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। সমাজ ও রাজনীতির নানা অসংগতি এবং কদর্য দিককে ব্যঙ্গাত্মক চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। রাজনীতিতেও প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হল। কালি, প্যাস্টেল ও জলরঙের জাদুকর যোগেন চৌধুরী আর নেই।
জন্ম ও শৈশব
১৯৩৯ সালে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার ডহরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ফরিদপুরের জমিদার ছিলেন। দেশভাগের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর পরিবার ভারতে চলে আসে। পরবর্তীকালে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তাঁরা।
ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট থেকে ১৯৬০ সালে তিনি চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজে পড়ার সময় মানিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরেন ব্রহ্ম, দেবকুমার রায়চৌধুরী, অপর্ণা রায়, বরেন নিয়োগী, রথীন মৈত্র, সত্যেন ঘোষাল, হরেন দাস, গোপাল ঘোষ ও কিশোরী রায়ের মতো শিল্পীদের সংস্পর্শে আসেন। পড়াশোনা শেষ করার পর প্রথমে হাওড়ার একটি স্কুলে এবং পরে হ্যান্ডলুম বোর্ডে কিছুদিন কাজ করেন।
প্যারিসে শিল্পচর্চা ও কর্মজীবন
ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯৬৫ সালে প্যারিসে যান যোগেন চৌধুরী। সেখানে তিনি চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন। প্যারিসে উইলিয়াম হ্যাটারের আতেলিয়ের ১৭-তে কাজ করেন এবং École Nationale Supérieure des Beaux-Arts-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও মিশর-সহ বিভিন্ন দেশের জাদুঘর ও শিল্পকলা প্রদর্শনশালা পরিদর্শন করেন।
১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে চেন্নাইয়ে কিছুদিন টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭২ সালে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে কিউরেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যাপনার দায়িত্বও পালন করেন।
তুলির আঁচড়ে উঠে এসেছিল মানুষের যন্ত্রণা
তুলিতে ও চারকোলে একের পর এক তিনি এঁকেছেন ভারী, বিকৃত অথচ গভীরভাবে মানবিক মুখ। মানুষের শরীর, দম্পতি ও নারী তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। দেশভাগের অভিজ্ঞতা এবং উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। মানুষের ভাঙাচোরা মুখ, শরীরের বিকৃতি এবং জীবনের নানা টানাপোড়েন তাঁর ছবিতে স্বতন্ত্র ভাষা পেয়েছিল।
কালি, প্যাস্টেল ও জলরঙের ব্যবহারে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব শিল্পভাষা। তাঁর ছবিতে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সামাজিক বাস্তবতা এবং সময়ের ক্ষত স্পষ্ট হয়ে উঠত। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় নিজস্ব শৈলী ও ব্যাকরণ নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গত ১৪ মাস ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন এই শিল্পী। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রয়াণের খবরে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে শিল্পীমহল।
শিল্পচর্চার স্থায়ী ঠিকানা ‘চারুবাসনা’
কলকাতায় নিজের উদ্যোগে গড়ে তুলেছিলেন ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’। এই প্রতিষ্ঠান তাঁর শিল্পচর্চা ও শিল্পভাবনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আধুনিক বাংলা চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায়, নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্করের মতো শিল্পীদের পর যাঁরা নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন, যোগেন চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে এক যুগের অবসান ঘটল। জীবনের স্পন্দন থেমে গেলেও তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্ম, স্বতন্ত্র শিল্পভাষা ও অবদান আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করবে।




