জীবন আসলে খুবই ছোট।তাতে রয়েছে সম্পর্কের টানাপোড়েন; কিংবা; মনের বোঝাবুঝিতে ভুল হয়ে যাওয়ার গল্প! মানুষ সামাজিক প্রাণী। সে সমাজ ছাড়া বাঁচেনা;যেমন জল ছাড়া মাছ। আবার অন্যদিকে মানুষের বেঁচে থাকা চার দেয়ালের পৃথিবীতে। কিন্ত সবার কপালে সেই চার দেয়ালের সুখ লেখা থাকে না! সে ছড়িয়ে যায় আরও বড় কোন জগতে। যেমনটা হয়েছিল গৌতম ভট্টাচার্য-র। কে তিনি? আসুন জানা যাক - খ্যাতনামা লেখিকা আইভি চট্টোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে 'উজান নাট্যদল,শেওড়াফুলি'র' প্রযোজনা 'অগস্ত্যযাত্রা'। গল্পটিকে নাটকে রূপ দিয়েছেন প্রখ্যাত নাট্যকার কুন্তল মুখোপাধ্যায়।
এই নাটকের মূল চরিত্র গৌতম ভট্টাচার্য। পেশায় ভূ-তাত্ত্বিক। চিরকাল কাজের জন্য 'ঘর-ছাড়া' ছিলেন। অবসরের পর,ঘরে ফিরে চাইলেন; 'জমিয়ে সংসার করতে'। স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে'কে চাইলেন আঁকড়ে ধরতে। এতদিনের জমানো সংসার করার অদম্য বাসনা উজাড় করতে চাইলেন তিনি।কিন্ত...দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে সংসারের সুর তাঁর কাছে হয়ে উঠল বিষের মত জ্বালা! একদিক থেকে দেখতে গেলে নিজের সংসারে নিজেই 'অনাহুত' হয়ে গেলেন।
ছেলে বিনু এবং মেয়ে বিন্তি--দুজনেরই চলন-বলন আধুনিক যুগের এবং মানসিকতাও। শান্ত,ধীর-স্থির,এবং পুরোনো মানসিকতার গৌতমবাবুর সাথে শুরু হল তাঁর সন্তানদের মনোমালিন্য এবং দ্বন্দ্ব। গৌতমবাবু নিজের মেয়ে শাড়ি পরা,কবিতা পড়া,বাংলা গান শোনা--বাংলা সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকা হবে;এমনটি চেয়েছিলেন, হিসেব মিলল না।ছেলের সাথে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে ছেলের কাছাকাছি আসতে চাইলেন--প্রত্যাখ্যাত হলেন! স্ত্রী সুজাতা'ও তাঁকে 'নিজের করে' নিতে অপারগ হলেন! গৌতমবাবু নিজেকে 'বিলিয়ে দিলেন' 'বাইরের পৃথিবী'র কাছে। দমদম,বাগবাজার এসব জায়গায় দুঃস্থ শিশুদের জন্য উজাড় হয়ে গেল গৌতম ভট্টাচার্য-র স্নেহের ঝুলি।
এরপর একদিন কাউকে কিছু না বলে ইতিহাস প্রসিদ্ধ শ্রমণ গৌতমবুদ্ধ এবং গৌতম ভট্টাচার্য-র কাহিনী এক হয়ে গেল।ভারতীয় পুরাণে বলা আছে অহংকারী,অত্যাচারী এবং আগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন শিষ্য বিন্ধ্যপর্বত'কে 'শিক্ষা' দিতে তাঁর গুরু অগস্ত্য তাকে নত হতে আদেশ দেন।বলেন তিনি যতদিন না ফিরছেন ততদিন বিন্ধ্য যেন এমনই নত থাকে। 'গুরুর আদেশ' বাধ্য শিষ্য বিন্ধ্যপর্বত মাথা পেতে নেয়। অগস্ত্য আর ফেরেননি। কারন, তিনি জানতেন কাউকে 'বিশেষ শিক্ষা' দিতে গেলে তার থেকে দূরে চলে যেতে হয়! ঠিক যে শিক্ষা শেষ দৃশ্যে তাঁর পরিবারকে দিলেন গৌতম ভট্টাচার্য।
গৌতমবাবুর 'নিরুদ্দেশ' সংক্রান্ত কেস তদন্ত করতে আসেন ইন্সপেক্টর বিবেকব্রত দাস। গৌতমবাবুর স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের সাথে আলাদা আলাদা করে কথা বলেন। জেনে নেন সকলের দৃষ্টিকোণ। তারপর? তারপর বিবেক-গৌতম দুজনেরই দেখা হয় শহর ছেড়ে অনেক দূরে পার্বত্য এক গ্রামে। সাক্ষী হয় একটি শিশু--বুধুয়া।
সময় অনেক কথা বলে যায়! মহানগরীর ফ্লুরোসেন্ট এবং নিওন আলোর দল সেই সব কথা জানে না। সব কথা তাদের জন্য নয়। কোন কথা পূর্ণিমার চাঁদ,লক্ষ্মীপেঁচার ডানার অলৌকিক সুরমূর্ছনাতেও লেখা থাকে!
নাটক রিভিউ: অগস্ত্যযাত্রা,
রচনা:আইভি চট্টোপাধ্যায়, নাট্যরূপ:কুন্তল মুখোপাধ্যায়,
প্রযোজনা: উজান নাট্যদল,শেওড়াফুলি
আলো:শঙ্কর মাঝি
অভিনয়: রথীন চ্যাটার্জী(গৌতম ভট্টাচার্য),স্বাতী ঘোষ চৌধুরী(সুজাতা)
শুভ ভদ্র(বিনু),পৌলমী পাঁজা(বিন্তি),আদিত্য চক্রবর্তী(বিবেক)
আহান চক্রবর্তী(বুধুয়া),অঙ্কন দাস(বিন্ধ্যপর্বত), এবং
লক্ষ্মী বিশ্বাস(অগস্ত্য)।
Excellent stage performance of the Artists. I enjoy that drama which is written in the light of present situation.