কলকাতা: দুই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের পরেও ফলাফলকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার দিল্লিতে দাঁড়িয়ে উপনির্বাচনকে কার্যত তাচ্ছিল্য করেই তিনি বলেন, “এটা কোনও ভোট হয়েছে যে, ফল নিয়ে বলব। এরা ঠিক মতো ছাপ্পাও মারতে পারে না!” রেজিনগরের একটি বুথে মোট ভোটারের তুলনায় বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বেশি বলে যে অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই প্রসঙ্গও টেনে আনেন মমতা। তাঁর দাবি, “৭৭২ জন ভোটার আর ভোট পড়েছে ৯০৯। তার মানে পুলিশকে দিয়ে ছাপ্পা করালে এরকমই হয়।” অর্থাৎ, বিপুল ব্যবধানে বিজেপির জয়কে জনমতের প্রতিফলন বলে মানতে রাজি নন তিনি। বরং ভোটের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুললেন তৃণমূল নেত্রী।
শুক্রবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের বাংলো থেকে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে যোগ দিতে রওনা হন মমতা। গাড়ির চালকের আসনে ছিলেন ডেরেক নিজেই। পাশের আসনে বসেছিলেন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সময়ই বাংলার উপনির্বাচনের ফল নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। তার আগে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর বক্তব্য নিয়েও মমতার প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন শুনেই বিরক্তি প্রকাশ করেন তৃণমূল নেত্রী। বলেন, “আরে ছাড়ুন, আরে ছাড়ুন ছাড়ুন। মাথাটা আগে ঠিক করতে বলুন।” তার পরেই ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ছাপ্পার অভিযোগ করেন তিনি।
মঙ্গলবার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে উপনির্বাচন হয়েছিল। শুক্রবার ফলপ্রকাশের পর দেখা যায়, দুই কেন্দ্রেই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে বিজেপি। শুধু জয়ের ব্যবধান নয়, নন্দীগ্রামে অতীতের নির্বাচনী পরিসংখ্যানও ছাপিয়ে গিয়েছে এবারের ফল। রেজিনগরেও বিজেপির জয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। দুই কেন্দ্রেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু ভোটার থাকা সত্ত্বেও বিজেপির এই সাফল্য রাজ্যের ভোটের সমীকরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছে। তবে ভোটের ফলকে কেন্দ্র করে এক দিকে বিজেপির উচ্ছ্বাস, অন্য দিকে তৃণমূলের কারচুপির অভিযোগ—দুইয়ে মিলে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথ ১৫ রাউন্ডের গণনা শেষে ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানিকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। গণনার শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের পিছনে ফেলে এগিয়ে ছিলেন তিনি। একাদশ রাউন্ডের শেষে তাঁর ব্যবধান পৌঁছে যায় ৯০ হাজার ২০৩ ভোটে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ২২ হাজারেরও বেশি। ফলে নন্দীগ্রামের নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন নজির তৈরি হয়।
প্রচারে গিয়ে নন্দীগ্রামের ভোটারদের কাছে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন শুভেন্দু। তাঁর আবেদন ছিল, উপনির্বাচনে জয়ের ব্যবধান যেন ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর জয়ের মার্জিনকেও ছাপিয়ে যায়। সে বার তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে নন্দীগ্রামে ৮১ হাজার ২৩০ ভোটে জিতেছিলেন তিনি। এবারের গণনায় সেই ব্যবধান অনেক আগেই পেরিয়ে যান হাসিরানি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর জয়ের ব্যবধান ছিল ৯ হাজার ৬৬৫ ভোট। উপনির্বাচনে হাসিরানির বিপুল জয় সেই ব্যবধানকেও বহুগুণ ছাপিয়ে গেল। ফলে শুভেন্দুর বেঁধে দেওয়া ‘লক্ষ্য’ পূরণ হয়েছে বলেই দাবি করছে বিজেপি।
হাসিরানির প্রার্থী হওয়া নিয়েও নন্দীগ্রামে আবেগের আবহ তৈরি হয়েছিল। শুভেন্দুর দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যুর পর তাঁর মাকে প্রার্থী করে বিজেপি। দলের দাবি, সেই আবেগের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের কাজ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নের বার্তাও ভোটারদের একাংশের কাছে পৌঁছেছে। জয়ের পর হাসিরানি দাবি করেন, প্রথম থেকেই দলের লক্ষ্য ছিল ব্যবধান বাড়ানো। এক মাস ধরে বিজেপির কর্মীরা সেই লক্ষ্যেই পরিশ্রম করেছেন। সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দাবিও করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উন্নয়নের বার্তা ভোটারদের একাংশের কাছে পৌঁছেছে।
তবে নন্দীগ্রামের ফল নিয়ে বিতর্কও কম নয়। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান ছিলেন হাসিরানির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হলে ফল অন্য রকম হতে পারত বলে দাবি করেছেন তিনি। অন্য দিকে, ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে যান আইএসএফ প্রার্থী সবে মেরাজ আলি খান। ফলে এক দিকে রেকর্ড ব্যবধানে জয়, অন্য দিকে বিরোধী প্রার্থীদের অভিযোগ—দুইয়ের টানাপড়েনে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বেড়েছে।
রেজিনগরেও বিজেপির প্রার্থী শাখারভ সরকার ৭২ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন। এই কেন্দ্রেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। ফলে বিজেপির বিপুল জয়কে ঘিরে সংখ্যালঘু ভোটের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটের একাংশ বিজেপির দিকে গিয়েছে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা থাকলেও বুথভিত্তিক ভোটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। উপনির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদেরও বিজেপিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন শুভেন্দু। ফল প্রকাশের পরে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “দুই কেন্দ্রেই রাষ্ট্রবাদী শক্তি জয়ী হয়েছে।” সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দাবিকেও নিজেদের সাফল্যের ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরছে বিজেপি।
রেজিনগরের একটি বুথের ফল নিয়েই শুক্রবার দুপুরে সমাজমাধ্যমে সরব হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি স্ক্রিনশট পোস্ট করে তাঁর দাবি, ওই বুথে মোট ভোটারের সংখ্যা ৭৭২, অথচ বিজেপি পেয়েছে ৯০৯ ভোট। এই হিসাবকে সামনে রেখেই ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, পুলিশকে ব্যবহার করে ছাপ্পা ভোট করানোর ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই দুই উপনির্বাচন হওয়ার পিছনেও রয়েছে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল। সে বার নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই কেন্দ্রেই জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরে ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। একই ভাবে, আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর নওদা ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই জেতার পর রেজিনগর আসনটি ছেড়ে দেন। সেই কারণেই শুক্রবার দুই কেন্দ্রে ভোটগণনা হয়।
বিজেপি এই ফলকে রাজ্যে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটার-প্রধান এলাকায় এত বড় ব্যবধানে জয়কে তারা তাৎপর্যপূর্ণ বলে দেখাতে চাইছে। অন্য দিকে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন। ফলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল শুধু দুই প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; রাজ্যের ভোটের সমীকরণ, সংখ্যালঘু ভোটের গতিপ্রকৃতি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা—তিনটি বিষয়েই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
