কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলেও, কেন্দ্রীয় সরকারের অস্বস্তি যে এখনও কাটেনি, তা স্পষ্ট হয়ে গেল শনিবারের ঘটনাপ্রবাহে। বরং বিরোধীদের একের পর এক প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফাকে তারা কোনওভাবেই এই আন্দোলনের শেষ পরিণতি হিসেবে দেখছে না। উল্টে এই ঘটনাকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন আরও জোরালোভাবে তুলতে শুরু করেছে বিরোধী শিবির।
কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, এনসিপি (শরদচন্দ্র পওয়ার), সমাজবাদী পার্টি-সহ একাধিক বিরোধী দলের বক্তব্য, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাত্র-যুবদের দীর্ঘ আন্দোলনের প্রথম সাফল্য মাত্র। কিন্তু যে প্রশ্নগুলি আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকে উঠেছিল, তার কোনওটিরই এখনও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে আন্দোলন থামার কোনও কারণ নেই। বরং এবার দাবি আরও জোরালো হবে।
বিরোধীদের সবচেয়ে বড় দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেশের ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। তাদের অভিযোগ, নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নামা ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে, ব্যাটন ব্যবহার করেছে, এমনকি পেলেট গানও চালানো হয়েছে। এই ঘটনার রাজনৈতিক দায় এড়াতে পারেন না প্রধানমন্ত্রী। তাই শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে সরকারের দায় শেষ হয়ে যায় না বলেই দাবি বিরোধীদের।
একই সঙ্গে বিরোধীদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। এর ফলে শুধু লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়নি, গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থাও তলানিতে এসে ঠেকেছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, বর্তমান সরকারের আমলে দেড়শোরও বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের কৌশলও এখন অনেকটাই স্পষ্ট। এতদিন তাদের প্রধান দাবি ছিল ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সেই দাবি পূরণ হওয়ার পর তারা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে প্রধানমন্ত্রীকে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, জয়রাম রমেশ, কেসি বেণুগোপাল— প্রায় প্রত্যেকেই এক সুরে দাবি তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে এসে এই বিষয়ে বক্তব্য রাখতে হবে। কেন বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, কেন ছাত্রদের রাস্তায় নামতে হল, কেন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করা হল— সেই সব প্রশ্নের উত্তরও তাঁকেই দিতে হবে।
আম আদমি পার্টিও একই সুরে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে। দলের জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রমাণ করে যে ছাত্র-যুবদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সামনে সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত এই লড়াই শেষ হবে না। আপ সাংসদ সঞ্জয় সিংহ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান এবং যুবকদের অধিকার রক্ষার বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
এনসিপি (শরদচন্দ্র পওয়ার)-এর প্রধান শরদ পওয়ারও এই ঘটনাকে শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, যন্তর-মন্তরে টানা আন্দোলন, ছাত্র-যুবদের ধৈর্য এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক সমর্থনের ফলেই সরকার নৈতিক দায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি এই ঘটনাকে দেশের গণতন্ত্র এবং যুবশক্তির বিজয় বলেই বর্ণনা করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসও একই অবস্থান নিয়েছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের দাবি, ধর্মেন্দ্র প্রধান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি, জনমতের চাপে সরকার তাঁকে কার্যত সরাতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে এখনও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে আন্দোলনের মূল দাবিগুলি এখনও অপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীরা এখন এই ইস্যুকে কেবল শিক্ষা মন্ত্রকের ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। তারা এটিকে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ, বেকারত্ব, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সরকারের জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত করার চেষ্টা করছে। সেই কারণেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরও বিরোধীদের আক্রমণের তীব্রতা কমেনি, বরং আরও বেড়েছে।
ফলে কেন্দ্রীয় সরকার আপাতত একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চাপ কিছুটা সামাল দিলেও, বিরোধীদের ধারাবাহিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে— তাদের পরবর্তী লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর সরকারের নীতিগত জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আগামী দিনে সংসদের ভিতরে-বাইরে এই ইস্যুতে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা তাই শেষ কথা নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক লড়াইয়ের সূচনা— এমনটাই মনে করছে বিরোধী শিবির। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন শুধু একজন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী নন, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মোদী সরকারের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।