স্পিতি: গাড়ি নেই। তাই পাহাড়ে যাওয়ার স্বপ্ন থেমে থাকবে—এমনটা মানতে নারাজ উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরের সুমিত কুমার প্রজাপতি। বন্ধুরা যখন গাড়ি নিয়ে হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন প্রশ্ন উঠেছিল, সুমিত যাবেন কী ভাবে? উত্তরটা ছিল আরও চমকপ্রদ—নিজের ই-রিকশা নিয়েই পাহাড়ে পাড়ি দিলেন তিনি। দুর্গম রাস্তা, খাড়া চড়াই, প্রায় ১২,৫০০ ফুট উচ্চতা—সব পেরিয়ে সেই ই-রিকশাই এখন নেটমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
দেখুন: https://www.instagram.com/reels/Dci0yWVBYbM/
ঘটনার শুরু মুজফ্ফরনগর থেকেই। সুমিতের বন্ধুরা গাড়ি করে স্পিতি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সুমিতের নিজের গাড়ি নেই। বন্ধুরা তাঁকে কার্যত প্রশ্নই করেছিলেন, ‘‘তুমি যাবে কী করে?’’ সেই প্রশ্ন থেকেই নাকি এমন অভিনব পরিকল্পনার জন্ম। গাড়ি না থাকলে নিজের ই-রিকশাই নিয়ে যাওয়া যাক! সেই সিদ্ধান্তেই শুরু হয় অন্য রকম পাহাড়যাত্রা।
তবে মুজফ্ফরনগর থেকে পুরো রাস্তা ই-রিকশা চালিয়ে যাননি সুমিত। প্রথমে বন্ধুদের সঙ্গে তিনি মানালি পৌঁছন। তাঁর ই-রিকশাটি আলাদা করে ট্রাকে করে মানালিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর ১৯ অগস্ট মানালি থেকে স্পিতির উদ্দেশে ই-রিকশা চালিয়ে একাই রওনা দেন তিনি।
পাহাড়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চার্জ হবে কোথায়?
ই-রিকশা নিয়ে স্পিতির মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা শুনেই নেটমাধ্যমে প্রশ্নের ঝড় ওঠে। এতটা পথ যাওয়ার পরে ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে কী হবে? পাহাড়ের রাস্তায় চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা কোথায়?
সুমিতের উত্তর ছিল প্রস্তুত। তাঁর ভিডিয়ো অনুযায়ী, রাতে যে সব জায়গায় তিনি থাকতেন, সেখানেই ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতেন। শুধু তার উপর নির্ভর না করে জরুরি পরিস্থিতির জন্য সঙ্গে রেখেছিলেন একটি জেনারেটরও। ফলে পথের মধ্যে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিছুটা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।
শুধু নিজের যাত্রা নয়, পথ চলতে চলতেই ই-রিকশাটিকে যাত্রী পরিবহণেও ব্যবহার করেছেন সুমিত। নেটমাধ্যমে এক জন তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ই-রিকশা যখন নিয়েই যাচ্ছেন, তখন একা না গিয়ে যাত্রী তুলুন। সেই পরামর্শ মেনে পরের দিন থেকেই পথে যাত্রী তুলতে শুরু করেন তিনি।
১২,৫০০ ফুটে ই-রিকশা! থমকে গেলেন অন্য পর্যটকেরা
যত পাহাড়ের গভীরে এগিয়েছেন সুমিত, ততই তাঁর ই-রিকশা হয়ে উঠেছে পথের অন্যতম আকর্ষণ। এক পর্যায়ে প্রায় ১২,৫০০ ফুট উচ্চতায় পাথুরে ও দুর্গম রাস্তা দিয়ে ই-রিকশা চালাতে দেখা যায় তাঁকে। রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য পর্যটকেরাও থেমে সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন।
কারও বিস্ময়—এমন রাস্তা দিয়ে ই-রিকশা যাচ্ছে কী ভাবে? কেউ আবার সুমিতের সাহসের প্রশংসা করেছেন। পাহাড়ি পথে সাধারণত শক্তিশালী গাড়ি, বিশেষ করে 4x4 গাড়ি ব্যবহার করতে দেখা যায়। সেখানে একটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়িকে এমন দুর্গম পথে দেখে স্বাভাবিক ভাবেই চোখ কপালে উঠেছে অনেকের।
এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেছেন সুমিত। ১৫ অগস্ট থেকে ইনস্টাগ্রামে যাত্রার নানা আপডেট দিতে শুরু করেন তিনি। রাস্তার পরিস্থিতি, চার্জ দেওয়ার সমস্যা, পাহাড়ের চড়াই এবং পথে মানুষের প্রতিক্রিয়া—সবই তুলে ধরেছেন ভিডিয়োয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর এই অভিযানের ভিডিয়োর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭-এ।
২৬ অগস্ট কুনজুম পাসে পৌঁছন সুমিত
অভিযানের অন্যতম বড় মুহূর্ত আসে ২৬ অগস্ট। ওই দিন সুমিত তাঁর ই-রিকশা নিয়ে কুনজুম পাসে পৌঁছন বলে তাঁর সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে জানানো হয়। পরে এই ঘটনাকে ঘিরে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ই-রিকশা নিয়ে কুনজুম পাসে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে এটি প্রথম নজির এবং ‘বিশ্বরেকর্ড’। তবে এই বিশ্বরেকর্ডের দাবি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে রেকর্ডের দাবি সত্যি কি না, তার থেকেও নেটমাধ্যমে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে অন্য একটি প্রশ্ন—একটি সাধারণ ই-রিকশা নিয়ে এমন দুর্গম পাহাড়ি পথে যাত্রা করা সম্ভব কী করে?
সুমিতের নিজের ভিডিয়োতেই রয়েছে সেই অভিযানের উত্তর। একাধিক জায়গায় থেমেছেন, ব্যাটারি চার্জ করেছেন, প্রয়োজনে জেনারেটর ব্যবহার করেছেন এবং ধাপে ধাপে এগিয়েছেন। অর্থাৎ কোনও একটানা দৌড় নয়, বরং পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে পাহাড় পেরিয়েছেন তিনি।
‘গাড়ি ছিল না, ই-রিকশাই আমার ভরসা’
সেপ্টেম্বরের একটি ভিডিয়োয় নিজের অভিযানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুমিত জানিয়েছেন, শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে পাহাড়ি কোনও গ্রামে কয়েক দিন কাটানোর স্বপ্ন তাঁরও ছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই—নিজের গাড়ি ছিল না। সেই সমস্যার সমাধান হিসেবেই ই-রিকশাকে সঙ্গে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা, যে জায়গায় মানুষ সাধারণত 4x4 গাড়ি নিয়ে যান, সেখানে তিনি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়ি নিয়ে পৌঁছেছেন। সেই অভিজ্ঞতাকেই তিনি ‘ইতিহাস তৈরি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
সুমিতের এই অভিযান এখন শুধুই একটি পাহাড় ভ্রমণের গল্প নয়। সাধারণ একটি ই-রিকশাকে সঙ্গী করে দুর্গম স্পিতির পথে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্তই তাঁকে নেটমাধ্যমের নজরে এনে দিয়েছে। গাড়ির দাম, ইঞ্জিনের ক্ষমতা কিংবা বড় কোনও পর্যটন সংস্থার সাহায্য নয়—নিজের পরিচিত যান আর জেদকে ভরসা করেই পাহাড়ে পৌঁছেছেন মুজফ্ফরনগরের এই যুবক।
আর তাই স্পিতির পাহাড়ি রাস্তায় এখন পর্যটকদের চোখে পড়া সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত দৃশ্যগুলির একটি—বরফঢাকা পাহাড়ের সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একটি ছোট্ট ই-রিকশা।