নয়াদিল্লি: নিট-সহ একাধিক সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম এবং তা ঘিরে দেশজুড়ে ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সেই রাজনৈতিক অভিঘাত কাটতে না কাটতেই দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার সন্ধ্যায় সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে গঠন করা হচ্ছে একটি ‘হাই-পাওয়ার টাস্ক ফোর্স’। এর নেতৃত্বে থাকবেন ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তথা দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তিবিদ নন্দন নিলেকানি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার মাত্র এক দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতা সামনে আসার পর সরকার চাপে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের আস্থা ফেরানোই এখন কেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যাঁরা তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, তাঁরা আজ জেলে রয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংসদেও কঠোর আইনি কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।”
তবে শুধু দোষীদের শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। মোদীর কথায়, “আমাদের এমন একটি পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার উপর প্রতিটি পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবক নিঃশর্ত আস্থা রাখতে পারেন। পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন লক্ষ্য।”
নন্দন নিলেকানির কাঁধে পরীক্ষা সংস্কারের দায়িত্ব
প্রধানমন্ত্রী জানান, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার জন্যই নন্দন নিলেকানির হাতে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন হাই-পাওয়ার টাস্ক ফোর্স দেশের বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে এবং কীভাবে প্রশ্নপত্র প্রস্তুতি, সংরক্ষণ, পরিবহণ, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা পরিচালনার গোটা প্রক্রিয়াকে আরও সুরক্ষিত করা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ করবে।
সরকারি সূত্রের ইঙ্গিত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল ট্র্যাকিং, এনক্রিপ্টেড প্রশ্নপত্র, বায়োমেট্রিক যাচাই, রিয়েল-টাইম নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। টাস্ক ফোর্সের রিপোর্টের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত করবে কেন্দ্র।
প্রশ্নফাঁস থেকে ইস্তফা, তারপর সংস্কারের বার্তা
গত কয়েক মাসে নিট-সহ একাধিক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। রাস্তায় নামেন হাজার হাজার ছাত্র-যুব। বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণের মুখে পড়ে কেন্দ্র। শেষ পর্যন্ত শনিবার শিক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়েন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নিজে সামনে এসে পরীক্ষা সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করায় কেন্দ্রের রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট— শুধু দায় নির্ধারণ নয়, গোটা পরীক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের পথেই হাঁটতে চায় সরকার।
‘বিশ্বাস ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’
ভিডিও বার্তার শেষেও ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে আশ্বাসের সুর শোনা যায় প্রধানমন্ত্রীর গলায়। তিনি বলেন, “টাস্ক ফোর্সের রিপোর্ট হাতে পেলেই দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করা হবে। আগামী দিনের পরীক্ষাগুলি যাতে সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য এবং নির্ভুলভাবে পরিচালিত হয়, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।”
কোটি কোটি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে নির্ভর করছে একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থার উপর, সেখানে নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে গঠিত এই হাই-পাওয়ার টাস্ক ফোর্সের সুপারিশ এখন শুধু প্রশাসনিক নথি নয়, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে চলেছে।