কাঠমান্ডু: জল নেই। কিন্তু জল যে কী রেখে গিয়েছে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। কোথাও ঘরের চিহ্ন নেই, কোথাও রাস্তা নেই, কোথাও সেতু ছিল—এখন শুধু উল্টে পড়ে থাকা কংক্রিটের টুকরো। পাহাড়ি নদীর বুক থেকে উঠে আসা কাদা, পাথর আর ধ্বংসাবশেষে ঢাকা চারপাশ। নেপালের রসুয়ায় দাঁড়ালে মনে হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার দুর্যোগ যেন বহু বছরের একটি জনপদকে এক নিমেষে মুছে দিয়েছে।
গ্রাউন্ড রিপোর্টে উঠে এসেছে সেই ভয়াবহতার ছবি। ক্যামেরা যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে বিপর্যয়ের গভীরতা। কোথাও কাদার নীচে চাপা পড়ে রয়েছে বাড়ি। কোথাও ভাঙা কাঠামোর মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে সংসারের টুকরো টুকরো স্মৃতি। যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন মানুষ যাতায়াত করতেন, সেখানেই এখন জমে রয়েছে পাথর আর পুরু কাদার আস্তরণ। সবচেয়ে কষ্টের দৃশ্য, স্বজনের খোঁজে মানুষের অপেক্ষা।
কেউ জানেন না তাঁর প্রিয়জন কোথায়। কেউ ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে খুঁজছেন পরিচিত কোনও চিহ্ন। কেউ আবার বিশ্বাস করতে চাইছেন না যে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর সাজানো সংসার এ ভাবে হারিয়ে যেতে পারে। পাহাড়ের গায়ে, নদীর ধারে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসতির পাশে তাই এখন শুধু উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতা নয়, শোনা যাচ্ছে স্বজন হারানো মানুষের আর্তনাদ।
রসুয়া নেপালের অন্যতম দুর্গম পাহাড়ি জেলা। চিন-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি এই এলাকায় পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সামান্য বিপর্যয়ও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রবল বৃষ্টি, পাহাড়ধস এবং আচমকা নেমে আসা জল ও পাথরের স্রোত নদীকে মুহূর্তের মধ্যে পরিণত করে ভয়ঙ্কর ধ্বংসের বাহনে।
স্রোতের সামনে কিছুই দাঁড়াতে পারেনি। বাড়ি, দোকান, রাস্তা, সেতু—সব যেন একসঙ্গে ভেসে গিয়েছে। কোথাও আবার কাদা ও পাথরের নীচে চাপা পড়েছে গোটা বাড়ি। নদীর ধার ঘেঁষে থাকা এলাকাগুলির পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।
জল নেমে যাওয়ার পর বিপর্যয়ের আসল চেহারা আরও পরিষ্কার হয়েছে। বন্যার জল চোখের সামনে থাকলে ধ্বংসের ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। কিন্তু জল সরে গেলে দেখা যায়—একটি বাড়ির জায়গায় কেবল কয়েকটি ভাঙা ইট, একটি সেতুর জায়গায় ঝুলে থাকা লোহার কাঠামো, আর একটি রাস্তার জায়গায় পাথর-কাদার বিশাল স্তূপ।
উদ্ধারকাজ তাই কঠিন। বহু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত। সেতু ভেসে গিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ধস নামার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপই ঝুঁকিপূর্ণ। তবু ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজ চলছে। এই বিপর্যয়ের মধ্যে আরও একটি ভয়ঙ্কর প্রশ্ন সামনে এসেছে, কেন এতটা বিপর্যয় সামলানোর মতো সময় পেল না মানুষ?
পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা অনেক সময় অত্যন্ত দ্রুত নেমে আসে। পাহাড়ের উপরে প্রবল বৃষ্টি, ধস কিংবা নদীর গতিপথে হঠাৎ বাধা তৈরি হলে মুহূর্তে বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি। রসুয়ার ক্ষেত্রেও সেই আকস্মিকতাই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে রসুয়ার মানুষের কাছে এখন বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যার চেয়েও জরুরি অন্য কিছু। নিখোঁজ মানুষগুলির কী হল?
ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে থাকা এক মানুষের কাছে হয়তো এখনও সেই বাড়িটিই তাঁর পৃথিবী। কাদার নীচে চাপা পড়ে থাকা কাঠের টুকরো, ছেঁড়া কাপড় কিংবা কোনও পরিচিত সামগ্রী—হয়তো তার মধ্যেই খুঁজছেন প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন।
প্রকৃতি তার তাণ্ডব থামিয়েছে। নদীর জলও অনেকটা নেমেছে। কিন্তু রসুয়ার মানুষের জীবনে যে ঢেউ আছড়ে পড়েছে, তা এত সহজে থামবে না। জল সরে গিয়েছে। কাদা শুকোবে। রাস্তা এক দিন আবার তৈরি হবে। নতুন সেতুও উঠবে। কিন্তু যে ঘরে আর কেউ ফিরবেন না, যে পরিবার অপেক্ষা করেই যাবে—সেই শূন্যতা কী দিয়ে ভরবে?
রসুয়ার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এখন তাই শুধু পুনর্গঠনের লড়াই নয়। চলছে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, হারিয়ে যাওয়া ঘর এবং হারিয়ে যাওয়া জীবনের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।




