রাজ্যে সরকার বদলের পর ফের খুলল আরজি কর-কাণ্ডের ‘বন্ধ ফাইল’। চিকিৎসক-পড়ুয়ার মৃত্যুর নেপথ্যে থাকা একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন করে তদন্তে নামল রাজ্য পুলিশ। আর সেই তদন্তের সূত্রেই দায়ের হল পৃথক এফআইআর। অভিযোগের কেন্দ্রে এ বার শুধু খুন নয়—অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, তথ্যপ্রমাণ লোপাট, দেহ দাহের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও উঠল গুরুতর প্রশ্ন। অন্য দিকে, নতুন করে তদন্তের গতি বাড়িয়েছে সিবিআইও।
নিহত চিকিৎসক-পড়ুয়ার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে পানিহাটির লোকসংস্কৃতি ভবনে আয়োজিত স্মরণসভা থেকেই নতুন তদন্তের ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে নিহতের মা-বাবার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীও। তাঁর ঘোষণা ছিল, ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে সম্পূর্ণ নতুন একটি মামলা দায়ের করা হবে। সেই ‘নির্দেশ’-এর পরের দিনই, সোমবার, ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন নিহত চিকিৎসকের বাবা। তার ভিত্তিতেই নতুন এফআইআর রুজু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এ বার তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ঘটনার দিন এত তড়িঘড়ি কেন দেহ দাহ করা হয়েছিল?
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ঘোলা থানার অন্তর্গত নাটাগড় কদমতলা শ্মশানে দেহ দাহের ক্ষেত্রে একাধিক গুরুতর অনিয়ম হয়েছিল। শ্মশানের নথিতে দাহের সিরিয়াল ছিল তিন নম্বরে। অভিযোগ, পরে সেই সিরিয়াল বদলে এক নম্বর করা হয় এবং দ্রুত দাহ সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, দাহের নির্ধারিত খরচ পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পরিবারের কোনও নিকটাত্মীয়ের বাধ্যতামূলক স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলির পিছনে কারা ছিলেন, সেটিই এখন নতুন তদন্তের অন্যতম বড় প্রশ্ন। স্মরণসভা থেকেই মুখ্যমন্ত্রী তৎকালীন পানিহাটি তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, ওই তিন জনের যোগসাজশেই দেহ দাহের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল। সেই মন্তব্যের পরই তাঁদের নাম-সহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের হয়েছে।
তবে তদন্তকারীদের সামনে এখন আরও বড় প্রশ্ন—দেহ দ্রুত দাহ করার পিছনে কি কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল? কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা প্রমাণ যাতে সামনে না আসে, সে কারণেই কি নিয়ম ভেঙে তড়িঘড়ি সৎকার করা হয়েছিল? নতুন এফআইআরে ‘তথ্যপ্রমাণ লোপাট’ এবং ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র’-এর মতো ধারার অভিযোগ থাকায় সেই সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দাহের সময় পরিবারের কাছ থেকে কোনও অর্থ নেওয়া হয়নি কেন, শ্মশানের রেজিস্টারে সিরিয়াল বদলের প্রয়োজনই বা কেন হল, কার নির্দেশে সেই পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং দাহের আগে-পরে কারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে নতুন তদন্তকারী দল। শ্মশানের নথি, রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, ফোনের কল রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বয়ানও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এর পাশাপাশি, কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে পুলিশের শীর্ষ তিন আধিকারিকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের সাসপেন্ড করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ আরজি কর-কাণ্ডের মূল তদন্তের পাশাপাশি এ বার ঘটনাটির পরবর্তী পর্বে পুলিশি ভূমিকা এবং দেহ দাহের প্রক্রিয়াও পৃথক তদন্তের আওতায় আসছে।
এখানেই নতুন তদন্তের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব। কারণ, আরজি কর-কাণ্ডের তদন্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। সিবিআইয়ের তদন্ত এবং আদালতের নজরদারির পাশাপাশি রাজ্য সরকার পৃথক মামলা করে দেহ দাহের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখতে চাইছে। প্রশাসনের বক্তব্য, আদালত বা সিবিআইয়ের তদন্তের নিজস্ব গতিকে কোনও ভাবে প্রভাবিত না করে, যে প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়, সেগুলিই নতুন তদন্তের মাধ্যমে সামনে আনা হবে।
ফলে ফের সামনে এল সেই রাতের একাধিক প্রশ্ন—কেন এত দ্রুত দেহ দাহ করা হয়েছিল? কে সিরিয়াল বদলানোর নির্দেশ দিয়েছিল? কেন পরিবারের কাছ থেকে দাহের খরচ নেওয়া হয়নি? কেন নিকটাত্মীয়ের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি? আর এই গোটা প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কি সত্যিই কোনও প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা ছিল?
নতুন এফআইআর সেই প্রশ্নগুলিরই উত্তর খোঁজার প্রথম ধাপ। এখন তদন্ত কোন দিকে গড়ায়, এবং নতুন করে ওঠা অভিযোগের পিছনে কতটা তথ্যপ্রমাণ মেলে, সেটাই নজরে।