আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্তে কি নতুন মোড় আসতে চলেছে? আদালতের নির্দেশে গঠিত সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (CBI)-এর নতুন স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT) যে নতুন করে গোটা মামলার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে, বৃহস্পতিবার শিয়ালদহ আদালতে জমা পড়া দ্বাদশ স্ট্যাটাস রিপোর্টে তারই ইঙ্গিত মিলল।
তদন্ত এখনও শেষ হয়নি জানিয়ে আদালতের কাছে আরও সময় চেয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন অগ্রগতি-সহ পরবর্তী স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। এই বহুচর্চিত মামলায় তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল। সেই প্রেক্ষিতে আদালত সম্প্রতি CBI-কে নতুন SIT গঠনের নির্দেশ দেয়। নির্দেশ ছিল, এতদিনের তদন্তের প্রতিটি ধাপ নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে এবং কোনও তথ্য বা প্রমাণ উপেক্ষিত হয়েছে কি না, তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
২০ খণ্ড নথি ফের খতিয়ে দেখছে নতুন SIT
বৃহস্পতিবার আদালতে CBI-র আইনজীবী জানান, আগের তদন্তকারী অফিসারের কাছ থেকে মামলার সমস্ত নথি, কেস ডায়েরি, সাক্ষ্য, ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি নতুন SIT-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মোট ২০ খণ্ড নথি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে তদন্তকারী দল। শুধু আগের তদন্তের উপর নির্ভর না করে, প্রতিটি তথ্য ও সাক্ষ্য নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছে। CBI সূত্রের বক্তব্য, নতুন SIT-এর লক্ষ্য শুধু চার্জশিটে থাকা তথ্য পর্যালোচনা নয়, বরং তদন্তে কোনও ফাঁক থেকে গিয়েছিল কি না, তা-ও খুঁজে দেখা।
ফরেন্সিক টিমের ভূমিকাও তদন্তের আওতায়
নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী এ দিন আদালতে দাবি করেন, নতুন SIT যেন শুধুমাত্র আগের তদন্তের পুনরাবৃত্তি না করে। বরং যেসব প্রশ্ন এতদিন উত্তরহীন রয়ে গিয়েছে, সেগুলিরও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। বিশেষ করে ঘটনাস্থলে কাজ করা ফরেন্সিক টিমের তিন সদস্যের ভূমিকা খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ফরেন্সিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল কি না, তা নতুন করে পরীক্ষা করার আর্জি জানানো হয়েছে আদালতে।
দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত হয়নি কেন?
মামলার অন্যতম বিতর্কিত বিষয় ছিল দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত না হওয়া। আদালতে জানানো হয়েছে, নতুন SIT এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে। কেন দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের প্রয়োজন মনে করা হয়নি, সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং তাতে কোনও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
নির্মল ঘোষের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে CBI
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। আদালতে জানানো হয়েছে, পানিহাটির তৎকালীন বিধায়ক নির্মল ঘোষের ভূমিকা নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করছে নতুন SIT। তিনি কীভাবে বা কোন পরিস্থিতিতে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই বিষয়েও তদন্তকারীরা নথি ও সাক্ষ্য যাচাই করছেন। যদিও এই বিষয়ে CBI এখনও প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেনি।
আরও সময় চাইল CBI
CBI-র তরফে আদালতকে জানানো হয়েছে, তদন্তের বহু দিক এখনও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বিপুল পরিমাণ নথি, প্রযুক্তিগত তথ্য, ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করতে সময় লাগছে। তাই তদন্ত শেষ করতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। আদালতকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।
কী বললেন নির্যাতিতার মা?
এ দিনের শুনানির পর নির্যাতিতার মা সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “সবটাই তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। এখনই কোনও মন্তব্য করতে চাই না। রাজ্য সরকার চার জন আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করেছে। আমি দুই সরকারের উপরই ভরসা করছি। তবে CBI আরও সময় চেয়েছে।” তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট, তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের অপেক্ষাতেই রয়েছে পরিবার।
দু'বছর পরও অধরা বহু প্রশ্ন
২০২৪ সালের আগস্টে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধারের পর গোটা দেশ স্তম্ভিত হয়ে যায়। চিকিৎসকদের লাগাতার আন্দোলন, রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ এবং দেশব্যাপী আলোড়নের জেরে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তভার যায় CBI-এর হাতে। মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া এগোলেও, প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ, প্রশাসনিক গাফিলতি, ঘটনার নেপথ্যে অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না এবং তদন্তের প্রথম পর্যায়ে কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চাপা পড়েছিল কি না— এই প্রশ্নগুলি এখনও পুরোপুরি মেটেনি।
সেই কারণেই আদালতের নির্দেশে গঠিত নতুন SIT-এর তদন্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে আইন মহল। কারণ, এই তদন্তের উপরই নির্ভর করছে আরজি কর-কাণ্ডের বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি না।