একুশে জুলাই। তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে এই দিনটি শুধুই একটি রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, বরং আন্দোলনের ইতিহাস, আত্মত্যাগের স্মৃতি এবং বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীক। সেই মঞ্চ থেকেই মঙ্গলবার এমন এক বার্তা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের ডাক দিতে গিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, "আমার কোনও ছুঁৎমার্গ নেই। ইন্ডিয়া জোট নিয়ে একসঙ্গে চলব। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে চাইলে একসঙ্গে আসুন।"
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই যে, 'ইন্ডিয়া' জোটের অন্যতম শরিক সিপিএম। যে দলের বিরুদ্ধে লড়াই করেই তৃণমূলের উত্থান, যে দলের আমলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৩ জন যুবক, সেই সিপিএমের সঙ্গেই বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রয়োজনে পথ চলার ইঙ্গিত দিলেন মমতা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতা হারানোর পর কি বাস্তব রাজনীতির চাপে পুরনো শত্রুকেও কাছে টানতে বাধ্য হচ্ছে তৃণমূল?
একুশের ইতিহাস, সিপিএম-বিরোধিতার রাজনীতি
ফিরে যেতে হবে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ে। তৎকালীন যুব কংগ্রেসের ডাকা মহাকরণ অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটার পরিচয়পত্রকে বাধ্যতামূলক করার দাবিতে কলকাতার রাজপথে আন্দোলন চলাকালীন পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় ১৩ জন যুবকের। সেই সময় রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট সরকার, নেতৃত্বে সিপিএম। সেই ঘটনার পর থেকেই বামেদের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন মমতা। প্রতিবছর ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন করে সেই ঘটনাকেই স্মরণ করে তৃণমূল।
পরবর্তী প্রায় দুই দশক ধরে সিপিএম-বিরোধী আন্দোলনই ছিল তৃণমূলের রাজনৈতিক মূলধন। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে বাম সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন মমতা। সেই ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলেই ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস।
ক্ষমতা বদলের পর বদলে যাচ্ছে কি কৌশল?
কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল বাংলার রাজনীতির ছবিটাই বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর এবার বিরোধী আসনে বসতে হয়েছে তৃণমূলকে। অন্যদিকে জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরকে একজোট রাখার প্রশ্নে এখনও অন্যতম সক্রিয় মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই 'ইন্ডিয়া' জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক সিপিএম।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে মমতা কার্যত বুঝিয়ে দিলেন, দিল্লির রাজনীতি আর বাংলার রাজনীতি এক নয়। জাতীয় স্তরে বিজেপিকে মোকাবিলা করতে গেলে অতীতের রাজনৈতিক সংঘাত ভুলে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলাই এখন তাঁর অগ্রাধিকার।
'ছুঁৎমার্গ নেই'— কেন তাৎপর্যপূর্ণ?
রাজনীতিতে বক্তব্যের সময় এবং মঞ্চ অনেক সময় বক্তব্যের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকে 'ছুঁৎমার্গ নেই' মন্তব্য সেই কারণেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, এই দিনটির আবেগ জড়িয়ে রয়েছে বাম আমলে নিহত ১৩ যুবকের স্মৃতির সঙ্গে। সেই মঞ্চ থেকেই সিপিএম-সহ ইন্ডিয়া জোটের সব শরিককে একসঙ্গে চলার আহ্বান নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
যদিও মমতা তাঁর বক্তব্যে কোথাও সিপিএমের নাম আলাদা করে উল্লেখ করেননি। তিনি বলেছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইলে বিরোধী শক্তিকে একজোট হতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের মতে, ইন্ডিয়া জোটের শরিক হিসেবে সিপিএমকে বাদ দিয়ে সেই আহ্বান বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ফলে তাঁর বক্তব্যে পরোক্ষভাবে বামেদের প্রতিও বার্তা রয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
বিতর্ক কেন?
এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, যে দিনটি তৃণমূল এতদিন সিপিএমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্মৃতির দিন হিসেবে তুলে ধরেছে, সেই দিনেই পুরনো শত্রুর সঙ্গে এক মঞ্চে চলার বার্তা দেওয়া রাজনৈতিক অবস্থানের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
অন্যদিকে তৃণমূলের যুক্তি, জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইকে সামনে রেখেই বিরোধী ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইয়ের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক টানা ঠিক নয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ছুঁৎমার্গ নেই' মন্তব্য সেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রথম স্পষ্ট ইঙ্গিত কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য দেবে আগামী দিনের রাজনীতি।