ওয়াশিংটন: আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন যে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীরা, তাঁদের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা। কর্মীদের গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি থেকে একাধিক বড় প্রযুক্তি সংস্থাকে সাময়িক ভাবে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তালিকায় রয়েছে টাটা, ইনফোসিস, এইচসিএল, উইপ্রো, কগনিজ্যান্ট এবং ক্যাপজেমিনির মতো সংস্থা। একই পদক্ষেপের আওতায় এসেছে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবও। এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির অধীনে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়া বাধার মুখে পড়তে পারে।
আমেরিকার শ্রম দফতরের বক্তব্য, বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির অপব্যবহার হয়েছে এবং তার ফলে মার্কিন নাগরিকদের কাজের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ। তবে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু কয়েকটি সংস্থার প্রশাসনিক সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আমেরিকায় কর্মরত বিপুল সংখ্যক ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অধিকার এবং পরিবারের স্থায়ী ভাবে সেখানে থাকার সম্ভাবনাও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
গ্রিন কার্ডের প্রক্রিয়ায় ঠিক কী বদল?
আমেরিকায় চাকরির সূত্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম বা PERM গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সাধারণত নিয়োগকর্তাকে দেখাতে হয়, সংশ্লিষ্ট পদে উপযুক্ত মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে স্থানীয় কর্মীদের কাজের পরিবেশ বা বেতনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে না। প্রয়োজনীয় শংসাপত্র পাওয়ার পরই নিয়োগকর্তা-নির্ভর গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপগুলিতে এগোনো যায়।
মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চিহ্নিত আটটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত নতুন PERM আবেদন গ্রহণ করা হবে না। একই সঙ্গে ওই সংস্থাগুলির জমা দেওয়া যে আবেদনগুলি এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, সেগুলির প্রক্রিয়াও আপাতত বন্ধ রাখা হবে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথে দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি হতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। PERM প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভিসা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। গ্রিন কার্ডের আবেদন এবং অস্থায়ী কর্মভিসার বিষয়টি এক নয়। যাঁরা H-1B ভিসায় কাজ করছেন, তাঁদের বর্তমান ভিসার বৈধতা ও ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ভর করবে তাঁদের নিজস্ব পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য অভিবাসন বিধির উপর। তবে স্থায়ী বসবাসের আবেদনে নতুন করে এগোনো বা আটকে থাকা আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিদেশি কর্মী নিয়োগের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম লক্ষ্য। প্রশাসনের যুক্তি, মার্কিন সংস্থাগুলি বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন সুবিধা নিয়েছে, যার ফলে স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ কমেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রযুক্তি শিল্পের নিয়োগব্যবস্থা ও ভিসা-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার উপর নজরদারি আরও কঠোর করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, গত কয়েক বছরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক বিদেশি কর্মীর জন্য ভিসা এবং স্থায়ী শ্রম-শংসাপত্রের আবেদন করা হয়েছে। প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, এই প্রবণতা মার্কিন কর্মীদের স্বার্থের পরিপন্থী। যদিও এই অভিযোগের চূড়ান্ত আইনি মূল্যায়ন এবং প্রতিটি সংস্থার ক্ষেত্রে তদন্তের ফল আলাদা বিষয়।
ভারতীয় কর্মীদের উপর কতটা প্রভাব পড়তে পারে?
এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে সেই সব ভারতীয় কর্মীর উপর, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় কাজ করছেন এবং নিয়োগকর্তার মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তাঁদের কারও আবেদন এখনও শুরু হয়নি, কারও আবেদন জমা পড়ে রয়েছে, আবার কারও ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপের জন্য অপেক্ষা চলছে। আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত থাকলে এই সমস্ত পরিকল্পনাই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যাঁদের পরিবার আমেরিকায় রয়েছে, সন্তানদের পড়াশোনা চলছে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা গ্রিন কার্ড পাওয়ার উপর নির্ভরশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না মিললে ভবিষ্যতে চাকরি পরিবর্তন, পরিবারের অভিবাসন পরিকল্পনা এবং আমেরিকায় দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সিদ্ধান্ত নতুন করে বিবেচনা করতে হতে পারে। তবে এখনই সংশ্লিষ্ট সব কর্মীকে আমেরিকা ছাড়তে হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। তাঁদের প্রত্যেকের ভিসার মেয়াদ, আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রশাসনিক নির্দেশের আওতা কী—তার উপরই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমেরিকার বাজারকে কেন্দ্র করে। বহু কর্মী প্রকল্পের প্রয়োজনে সেখানে যান এবং দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন। তাঁদের একটি অংশ পরে স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করেন। ফলে অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়তে পারে কর্মী নিয়োগ, কর্মী ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক প্রকল্প পরিচালনার উপরেও। এখন নজর থাকবে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি কী পদক্ষেপ করে, মার্কিন প্রশাসনের তদন্তে কী উঠে আসে এবং স্থগিত আবেদনগুলির বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশ কী হয়। আপাতত স্পষ্ট, আমেরিকায় স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষায় থাকা ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্য নতুন করে অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।