কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর অভিমুখে বিরোধী শিবিরের ‘ইন্ডি’ জোটের সাংসদদের মিছিল ঘিরে উত্তাল জাতীয় রাজনীতি। ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে নিজেদের তীব্র আপত্তি জানাতে সংসদ ভবনের মকর দ্বার থেকে নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে পদযাত্রা করেন বিরোধী সাংসদরা। মিছিলে সামনের সারিতে দেখা যায় কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং এনসিপি (এসপি) সাংসদ সুপ্রিয়া সুলেকে। তাঁদের সঙ্গে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি-সহ একাধিক বিরোধী দলের সাংসদও পা মেলান। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যাঁদের নাম কোনও ভাবেই বাদ পড়া উচিত ছিল না। এই অভিযোগকে সামনে রেখেই তাঁরা ‘ভোট চুরি’র স্লোগান তোলেন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়ে বিরোধী সাংসদদের দাবি, ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে তাঁরা কোনও ভাবেই পিছিয়ে যাবেন না। জাতীয় রাজনীতিতে এমনিতেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতর চলছে। তার মধ্যেই দিল্লির রাজপথে এই মিছিল সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলল।
বিরোধী শিবিরের মূল নিশানায় অবশ্য ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারও। বিরোধী দলগুলির দাবি, SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ অথবা অপসারণের দাবিও তুলেছেন তাঁরা। কংগ্রেসের প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাঁর বক্তব্য, ভোটাধিকার গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি এবং সেই অধিকার নিয়ে কোনও রকম আপস করা যায় না। শুধু দিল্লিতে সংসদ ভবনের সামনে প্রতিবাদ করেই থামতে চান না বিরোধীরা। জেলা স্তর পর্যন্ত আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। ফলে SIR-কে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার যাতে কোনও ভাবেই খর্ব না হয়, সেটিই তাঁদের আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য।
এই রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই মিছিলের মঞ্চে আলাদা করে নজর কেড়েছেন সমাজবাদী পার্টির সাংসদ জয়া বচ্চন। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি ঈশ্বরের প্রতি আস্থার কথাও বলেন। তাঁর কথায়, ‘"গণেশ জি কখনও কোনও ভুল বা অন্যায় কাজে সাহায্য করেন না।" শুভ কাজ বা প্রার্থনা শুরুর আগে গণেশের আরাধনার ভারতীয় ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে জয়া বলেন, ন্যায়ের লড়াইয়ে তাঁরা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ও সুরক্ষার উপর বিশ্বাস রাখেন। তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মাত্রা যোগ করে। অন্যদিকে এনসিপি (এসপি) সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে দাবি করেন, মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে সামনে রেখেই তাঁরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পথে এই আন্দোলন করছেন। কোনও রকম বিশৃঙ্খলা নয়, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজেদের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য বলে জানান তিনি। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের অভিযোগ জানানো এবং ভোটারদের আশঙ্কার কথা তুলে ধরাই এই পদযাত্রার উদ্দেশ্য।
তবে ‘ইন্ডি’ জোটের সব শরিককে এ দিনের কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। আম আদমি পার্টি এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকের মতো কয়েকটি দল এই মিছিলে অংশ নেয়নি। তা সত্ত্বেও কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি-সহ মোট ১৯টি বিরোধী দল কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়েছে বলে বিরোধী শিবিরের দাবি। আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ হিসাবেও রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করেছে বিরোধীরা। তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ে থাকে, তা হলে সেই অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন জরুরি। বিরোধীরা রাষ্ট্রপতির কাছে বিষয়টি তুলে ধরে হস্তক্ষেপের আবেদন জানাতে চান। সব মিলিয়ে SIR ঘিরে নির্বাচন কমিশন এবং বিরোধীদের সংঘাত যে আরও তীব্র হতে চলেছে, দিল্লির এই মিছিল তারই ইঙ্গিত দিয়েছে। ভোটার তালিকা, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা— এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতির ময়দানে আরও বড় লড়াইয়ের আবহ তৈরি হচ্ছে।
