বিশেষ প্রতিবেদন: হুগলির ধনেখালি। ব্যস্ততা থেকে খানিক দূরে ছোট্ট গ্রাম পলাশী। শরতের আকাশে যখন কাশফুল দোলে, চারদিকে যখন দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে সাজ সাজ রব, তখন এই গ্রামের এক প্রাচীন মন্দিরে দেবীকে ঘিরে চলে এক অন্যরকম আরাধনা। প্রায় তিনশো বছর ধরে এখানে পূজিত হয়ে আসছেন পতিদুর্গা, যাঁর পুজোয় নেই আড়ম্বর, নেই প্রচলিত দুর্গামূর্তির সমস্ত পরিচিত বৈশিষ্ট্য। আছে বিশ্বাস, ভক্তি আর এক গভীর আধ্যাত্মিক পরম্পরা।
পলাশীর পতিদুর্গার রূপও বেশ আলাদা। দশভুজা নন তিনি, রয়েছে মাত্র দু’টি হাত। তাঁর পাশে নেই লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী কিংবা মহিষাসুর। দেবীর ডানদিকে থাকেন মহাদেব, তাঁর পায়ের কাছে থাকে ষাঁড়। দেবীর পায়ের নীচে থাকে সিংহ। বাঁদিকে জয়া এবং ডানদিকে বিজয়ার উপস্থিতি এই মূর্তিকে আরও স্বতন্ত্র করে তোলে।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশের কাহিনি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বহু বছর আগে এক দরিদ্র বৃদ্ধা ভিক্ষা করে জীবন কাটাতেন। একদিন শুকিয়ে যাওয়া ঘিয়া নদী পার হওয়ার সময়ে আচমকাই নদীতে জল বেড়ে যায়। অসহায় হয়ে তিনি একটি বেলগাছের নীচে বসে দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন। ঠিক সেই সময় একটি তালগাছের ডোঙা ভেসে আসে। এক অচেনা নারী তাঁকে সেই ডোঙায় করে নদী পার করে দেন। কিছুটা পথ যাওয়ার পর সেই নারীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এর পরেই স্বপ্নে দেবীর দর্শন পান বৃদ্ধা। দেবী জানান, ঘিয়া নদীর পাড়ে তাঁর মূর্তি রয়েছে। সেই মূর্তি এনে যেন পুজো করা হয়। কিন্তু বৃদ্ধার মনে প্রশ্ন জাগে, নিজেরই যখন অন্ন জোটে না, তখন দেবীর ভোগ কীভাবে হবে? স্বপ্নে দেবী তাঁকে আশ্বস্ত করেন, ‘তোমার যা জুটবে, তাই দিয়েই আমায় পুজো করো।’ তালপাতার ছাউনির নীচে পুজো করার নির্দেশও দেন তিনি। সঙ্গে জানান, কোনও ব্রাহ্মণ নয়, পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই তাঁর পুজো করবেন।
সেই বিশ্বাস আজও অটুট। পন্ডিত পরিবারের সদস্যরাই বংশপরম্পরায় এই পুজোর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পরিবারটি হাড়ি সম্প্রদায়ের। তাঁদের বিশ্বাস, দেবীর আরাধনায় জাঁকজমকের প্রয়োজন নেই; আন্তরিকতাই সবচেয়ে বড় নিবেদন।
পুজোর প্রধান উপকরণ জল ও তুলসী। ভক্তদের দেওয়া সামগ্রী দিয়েই তৈরি হয় নৈবেদ্য। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত নিয়ম মেনে পুজো হয়। অষ্টমীর সন্ধিপুজো এবং নবমীতে পশুবলির রীতিও রয়েছে। পরিবারের সদস্যরাই সেই আচার সম্পন্ন করেন। জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৫ তারিখে হয় অন্নকূট উৎসব।
একসময় এখানে পাথরের মূর্তি পুজো করা হলেও বর্তমানে মাটির প্রতিমা তৈরি করে আরাধনা করা হয়। তবে অন্য অনেক দুর্গাপুজোর মতো বিসর্জন হয় না।
পন্ডিত পরিবারের সদস্যদের কথায়, দেবীর কৃপায় একসময়কার আর্থিক অভাব অনেকটাই কেটে গিয়েছে। প্রতিদিন দু’বার নিত্যপুজো হয়। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন মনস্কামনা নিয়ে। তাঁদের বিশ্বাস, পতিদুর্গার দরবারে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে মনের ভক্তির মূল্যই বেশি।
তাই পলাশীর এই পুজো যেন মনে করিয়ে দেয়, দেবীকে পাওয়ার জন্য সোনার অলঙ্কার বা বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন নেই। একমুঠো বিশ্বাস, একফোঁটা জল, কয়েকটি তুলসীপাতা আর নিঃস্বার্থ প্রার্থনাতেই কখনও কখনও ঈশ্বরের সঙ্গে তৈরি হয়ে যায় মানুষের সবচেয়ে গভীর আত্মিক সম্পর্ক।
