নয়াদিল্লি: সমুদ্রের জল হঠাৎ গোলাপি! দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কোনও সিনেমার দৃশ্য। কিন্তু সেই গোলাপি রঙের পিছনে ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অভিনব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। ২০২৫ সালের অগস্টে আমেরিকার গাল্ফ অব মেনে প্রায় ১৬,৫০০ গ্যালন অত্যন্ত পরিশোধিত সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড, অর্থাৎ ‘লাই’, সমুদ্রে ছেড়েছিলেন গবেষকেরা। সঙ্গে ছিল উজ্জ্বল গোলাপি রঙের একটি বিশেষ ট্রেসার। উদ্দেশ্য একটাই—সমুদ্রের জলকে এমন ভাবে পরিবর্তন করা, যাতে তা বাতাস থেকে আরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে।
পরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল সামনে আসতেই বিজ্ঞানীমহলে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাসায়নিক প্রয়োগ করা জলভাগ আশপাশের সমুদ্রজলের তুলনায় বেশি পরিমাণে বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করার ক্ষমতা দেখিয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পরীক্ষার পর যে সামুদ্রিক জীবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে পরীক্ষার কারণে পরিমাপযোগ্য ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি। তবে এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য বলার সময় এখনও আসেনি।
কেন সমুদ্রে ‘লাই’?
এর পিছনে রয়েছে সমুদ্র ও জলবায়ুর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মানুষের তৈরি কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি বড় অংশ সমুদ্র শোষণ করে। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে। কিন্তু এর অন্য দিকও রয়েছে। বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে গিয়ে সমুদ্রের জল ক্রমশ অম্লীয় হয়ে উঠছে। এই ‘ওশান অ্যাসিডিফিকেশন’ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে ঝিনুক, শামুক-সহ খোলস তৈরি করা প্রাণীদের উপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সমুদ্রের ক্ষারত্ব সামান্য বাড়ানো গেলে জল আরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারবে এবং একই সঙ্গে অতিরিক্ত অম্লত্বও কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। এই পদ্ধতির নাম ‘Ocean Alkalinity Enhancement’ বা সমুদ্রের ক্ষারত্ব বৃদ্ধি। সহজ ভাষায়, অনেকটা সমুদ্রকে ‘অ্যান্টাসিড’ দেওয়ার মতো। ক্ষারীয় পদার্থ জলে মেশালে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সমুদ্রের কার্বন ডাই-অক্সাইড ধারণের ক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে সমুদ্রের মতো বিশাল ও জটিল বাস্তুতন্ত্রে এই পদ্ধতি কতটা নিরাপদ এবং কার্যকর, সেটিই এখন বিজ্ঞানীদের বড় প্রশ্ন।
গোলাপি জল কেন?
২০২৫ সালের অগস্টে গাল্ফ অব মেনে করা এই পরীক্ষায় প্রায় ১৬,৫০০ গ্যালন পরিশোধিত সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি সরাসরি ঘন অবস্থায় সমুদ্রে ঢেলে দেওয়া হয়নি; পরীক্ষার উদ্দেশ্য অনুযায়ী তা জল দিয়ে মিশিয়ে প্রয়োগ করা হয়।
এর সঙ্গে মেশানো হয়েছিল একটি উজ্জ্বল গোলাপি রঙের জলীয় ট্রেসার। এই রং পরিবেশকে গোলাপি করে দেওয়ার জন্য নয়, বরং বিজ্ঞানীদের জন্য ছিল এক ধরনের ‘চিহ্ন’। সমুদ্রে রাসায়নিক মেশানোর পর সেই জল কোথায় যাচ্ছে, কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং কতটা পাতলা হয়ে যাচ্ছে, তা চোখে পড়ার মতো করে অনুসরণ করতেই এই ট্রেসার ব্যবহার করা হয়।
প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে জলে রাসায়নিক ছাড়ার পর গবেষকেরা ওই জলভাগের গতিপথ অনুসরণ করতে শুরু করেন।
পাঁচ দিন ধরে চলল নজরদারি
পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাসায়নিক ছেড়ে দেওয়ার পরের পর্যবেক্ষণ। গবেষকেরা প্রায় পাঁচ দিন ধরে ওই জলভাগের গতিবিধি অনুসরণ করেন। ব্যবহার করা হয় গবেষণাজাহাজের পাশাপাশি জলের নীচে চলতে সক্ষম স্বয়ংক্রিয় যান, রোবোটিক গ্লাইডার এবং উপগ্রহ-নির্ভর পর্যবেক্ষণ। গোলাপি ট্রেসার এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ট্রেসারের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, রাসায়নিক মেশানো জল কী ভাবে স্রোতের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে।
একই সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া তথ্যকে কম্পিউটার মডেলের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, বাস্তব পরিস্থিতিতে জলভাগের গতিবিধি অনেকটাই গবেষকদের মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কয়েক দিন পর ট্রেসার এবং জলের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও প্রত্যাশিত মাত্রার দিকে ফিরে আসে।
বাড়ল কি কার্বন শোষণ?
এই পরীক্ষার আসল উদ্দেশ্য ছিল সেটিই। শুধু সমুদ্রের জলে রাসায়নিক মিশল কি না, তা দেখাই বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল না। তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন—ক্ষারত্ব বাড়ানোর ফলে সত্যিই কি সমুদ্র বাতাস থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নিতে পারে? প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, উত্তরটি আশাব্যঞ্জক। পরীক্ষাধীন জলভাগের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের ক্ষমতা বাড়তে দেখা গিয়েছে।
অর্থাৎ, সমুদ্রের ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রিত ভাবে বাড়িয়ে দিলে সেটিকে কার্বন অপসারণের একটি সম্ভাব্য পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে—এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এই ফল গুরুত্বপূর্ণ কারণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু নতুন করে কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়, ইতিমধ্যে বায়ুমণ্ডলে জমে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড কমানোর উপায়ও খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।
সামুদ্রিক প্রাণীদের কী হল?
তবে কার্বন কমলেই পরীক্ষাকে সফল বলা যায় না। সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে যদি কার্বন শোষণ বাড়ানো হয়, তা হলে সেই পদ্ধতি কতটা গ্রহণযোগ্য—সেটিই হয়ে উঠবে বড় প্রশ্ন। তাই পরীক্ষার সময় এবং পরে বিভিন্ন সামুদ্রিক জীবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
ব্যাকটেরিয়া, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জুপ্ল্যাঙ্কটন থেকে শুরু করে মাছ ও লবস্টারের লার্ভা—বিভিন্ন স্তরের জীবকে পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছিল। প্রাথমিক ফলাফলে পরীক্ষার কারণে ওই নমুনাগুলির মধ্যে পরিমাপযোগ্য কোনও বড় ধরনের ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, পরীক্ষার আওতায় থাকা সামুদ্রিক জীবের উপর তাৎক্ষণিক উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ধরা পড়েনি।
তবে এখানেই শেষ কথা নয়
বিজ্ঞানীদের কাছে এই পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। একটি ছোট পরিসরের নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় ক্ষতিকর প্রভাব না পাওয়া মানেই বিশাল সমুদ্রজুড়ে একই পদ্ধতি নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা যায় না।
সমুদ্র কোনও স্থির জলাধার নয়। জোয়ার-ভাটা, সমুদ্রস্রোত, তাপমাত্রা, গভীরতা, লবণাক্ততা এবং জীববৈচিত্র্যের কারণে প্রতিটি এলাকার পরিস্থিতি আলাদা।
আরও বড় পরিমাণে রাসায়নিক প্রয়োগ করলে ফলও বদলে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশৃঙ্খল, মৎস্যসম্পদ এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। এই কারণেই গবেষকেরা বলছেন, আরও পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
অনুমতি নিয়েই হয়েছিল পরীক্ষা
এই পরীক্ষা গোপনে করা হয়নি। মার্কিন পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা EPA-র অনুমোদন নিয়েই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল। প্রায় এক বছর ধরে পর্যালোচনা এবং জনমত গ্রহণের পর পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
এর ফলে সমুদ্রে ক্ষারীয় পদার্থ প্রয়োগ করে কার্বন শোষণ বাড়ানোর ধারণাটি প্রথম বার বাস্তব সমুদ্র পরিবেশে নিয়ন্ত্রিত ভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ পায় গবেষকেরা। পরীক্ষার তথ্য ভবিষ্যতের বড় গবেষণায় ব্যবহার করা হবে।
জলবায়ু সমস্যার ‘জাদু সমাধান’ নয়
বিজ্ঞানীদের কাছে এই পরীক্ষা কোনও ‘ম্যাজিক সলিউশন’ নয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ—জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং বিপুল গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন—বন্ধ করার বিকল্প হতে পারে না সমুদ্রের ক্ষারত্ব বাড়ানো। বরং এই পদ্ধতিকে সম্ভাব্য অতিরিক্ত হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি যদি সমুদ্রের সাহায্যে বায়ুমণ্ডল থেকে আরও কিছু কার্বন সরিয়ে নেওয়া যায়, তা হলে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় সেটি ভবিষ্যতে একটি ভূমিকা নিতে পারে।
গাল্ফ অব মেনের পরীক্ষায় সেই সম্ভাবনার দরজা খানিকটা খুলেছে। গোলাপি রঙের সেই জল কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে গেলেও রেখে গিয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—সমুদ্রকে কতটা বদলালে সে আরও বেশি কার্বন শুষবে, আর সেই বদলের মূল্য কতটা দিতে হবে পরিবেশকে? সেই উত্তর খুঁজতেই এখন আরও বড় পরীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞানীমহল।
