নিউজ ডেস্ক: অনেকের মতে মৃত্যুই সবকিছুর শেষ নয় তা দৃশ্যমান জগত থেকে অদৃশ্য পিতৃলোকে চেতনার রূপান্তর মাত্র। সেই অদৃশ্য লোকে বাস করা পূর্বপুরুষদের সঙ্গে রক্তমাংসের উত্তরসূরিদের সংযোগ ঘটায় যে ঋতুসন্ধি, তাকেই শাস্ত্র বলে ‘পিতৃপক্ষ’।
আশ্বিনের আগমনী হাওয়ার মাঝেই শুরু হয়েছে পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা নিবেদনের বিশেষ পক্ষ পিতৃপক্ষ। লোকমুখে যা শ্রাদ্ধপক্ষ কিংবা কথ্য ভাষায় ‘কনাগত’ বা ‘কর্ণাগত’ নামেও পরিচিত। এ বছর ২৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণিমা তিথির মধ্য দিয়ে যে পুণ্যলগ্নের সূচনা ঘটেছে, তা চলবে আগামী ১০ অক্টোবর সর্বপিতৃ অমাবস্যা পর্যন্ত।
সনাতন রীতি অনুযায়ী, গোটা পক্ষকাল জুড়ে সমস্ত রকমের মাঙ্গলিক উৎসব ও শুভ অনুষ্ঠান মুলতুবি রেখে মানুষ মূলত মগ্ন থাকেন প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণে।
ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন নদীঘাট ও তীর্থক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে শ্রদ্ধাশীল মানুষের ভিড়। তিল, যব, চাল, মধু আর ঘিয়ে তৈরি পিণ্ড এবং অঞ্জলিভরা জলের তর্পণ নিবেদনে শান্তিকামনা করা হচ্ছে বিদেহী আত্মাদের। লোকবিশ্বাস, এই পক্ষকালে মর্ত্যে নেমে আসেন পূর্বসূরিরা, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তৃপ্তি অর্পণই পারিবারিক সমৃদ্ধি ও কল্যাণের পথ প্রশস্ত করে।
এই তিথির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহাভারতের দানবীর কর্ণের এক অদ্ভুত আখ্যান। কুরুক্ষেত্রের সমরাঙ্গনে পতন ঘটার পর সূর্যপুত্র কর্ণ যখন স্বর্গে পৌঁছান, তখন খাদ্য হিসেবে তাঁর সামনে কেবলই রাখা হচ্ছিল কাঁচা সোনা আর মণিরত্ন। ক্ষুধার্ত কর্ণ দেবরাজকে প্রশ্ন করেছিলেন, এ কেমন বিড়ম্বনা? উত্তর এসেছিল—জীবদ্দশায় তিনি রত্ন ও ভূমি দান করে দাতা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে একবিন্দু জল বা একমুঠো অন্ন কখনও অর্পণ করেননি। মৃত্যুর পর স্বর্ণমুদ্রা কোনো আত্মার ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না, আত্মাকে তৃপ্ত করতে পারে কেবল অন্ন, জল আর আন্তরিক শ্রদ্ধার স্পন্দন।
পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়। মর্ত্যে ফিরে তিনি প্রতিটি দিন ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেন, তৃষিতের বুকে জল ঢেলে দেন।সেই ঘটনার স্মৃতিতেই আজও অনেকে এই পক্ষকে ‘কর্ণাগত’ বলেন এবং অন্নদানকে শ্রদ্ধার প্রধান অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেন।
এবারের পক্ষকালের তিথি বিন্যাসে কিছুটা ব্যতিক্রমও চোখে পড়ছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণিমা ও ২৭ তারিখ প্রতিপদার পর একে একে এগিয়েছে দ্বিতীয়া ও তৃতীয়ার কাজ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার একই দিনে সম্পন্ন হয়েছে চতুর্থী ও পঞ্চমী উভয় তিথির শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। আজ, ১ অক্টোবর পালিত হচ্ছে ষষ্ঠীর তর্পণ। এর পর সপ্তমী (২ অক্টোবর), মহাষ্টমী (৩ অক্টোবর), মাতৃনবমী (৪ অক্টোবর) ও দশমী (৫ অক্টোবর) পেরিয়ে আগামী সপ্তাহে প্রবেশ করবে পিতৃপক্ষ। আগামী ৬ অক্টোবর একাদশীর পর ৭ অক্টোবর একই সঙ্গে দ্বাদশী ও মঘা শ্রাদ্ধ নির্দিষ্ট রয়েছে। পরবর্তীতে ত্রয়োদশী (৮ অক্টোবর) ও চতুর্দশীর (৯ অক্টোবর) পর মহালয়া তথা সর্বপিতৃ অমাবস্যায় (১০ অক্টোবর) সমাপ্তি ঘটবে এই ষোলো দিনের পুণ্যযাত্রার।
