স্বাগত ভট্টাচার্য: দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা আর সমাজবাস্তবতার জ্বলন্ত দলিল যিনি সেলুলয়েডে বন্দি করেছিলেন, ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার ঢাকায় জন্ম নেওয়া সেই কালজয়ী চলচ্চিত্রকার ও নাট্যব্যক্তিত্বের জন্মের ১০১ বছর পূর্ণ হলো আজ। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন সেলুলয়েডের ক্ষ্যাপা ইকারুস, ঋত্বিক ঘটক।
এক আপসহীন শিল্পসত্তার নাম ঋত্বিক ঘটক। বাংলাকে কেটে দু'টুকরো করা হলো। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু, বিপন্ন মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই আর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া সমাজকে ফ্রেমে আনলেন তিনি এবং চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ বদলে দিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রকে দিলেন এক নতুন ভাষা। বাণিজ্যিক সাফল্যকে লাথি মেরে নিজের ছবি এবং সোজা কথার ওপর বাজি ধরে তিনি কাটিয়েছিলেন তাঁর গোটা জীবন। বেঁচে থাকতে মানুষটি যথেষ্ট মর্যাদা পাননি, তবে পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র জগৎ উপলব্ধি করেছে ঋত্বিক কুমার ঘটককে। তাঁর কাজগুলো দুর্গা কে দিয়ে যাওয়া কথার মতোই আজও থেকে গেল।
বোহেমিয়ান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঋত্বিকের আকস্মিক মৃত্যুতে লিখেছিলেন, ‘তুমি গেছো, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে/ পোড়া পাথরের মতো পড়ে আছো বাংলাদেশে, পাশে ঋত্বিক...’। এই কবিতা যেন বর্তমান সময়ে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ঋত্বিকের ছবির তালিকায় রয়েছে ‘নাগরিক’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এবং ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। প্রত্যেকটি ছবিই যেন ঋত্বিকের বুকের মধ্যে দেশভাগের পাথরচাপা আর্তনাদের এক-একটি জলজ্যান্ত দলিল। ঋত্বিকের চোখ নাগরিক ও সহনাগরিকের ক্ষতকে যেভাবে আবিষ্কার করেছিল, বাংলা সিনেমায় সেটা আর কেউই করতে পারেননি।
কলকাতার কফি হাউস, খালাসিটোলা কিংবা ছন্নছাড়া আড্ডায় ঋত্বিকের জীবনে দেশি মদের প্রকোপ বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিনের তীব্র মদ্যাসক্তির ফলে তাঁর শরীর প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মারণব্যাধি যক্ষ্মা। কোনও নিয়ম বা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খল তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি। শিল্পের প্রতি সততা বজায় রাখতে গিয়েই হতাশার চোরাবালিতে পা ডোবান ঋত্বিক ঘটক। ‘সুবর্ণরেখা’ সৃষ্টির পর দীর্ঘদিন তাঁর হাতে কোনও ছবি ছিল না। নিজের প্রতি অত্যাচারের জেদ সেই সময় থেকেই। বাংলা মদ তখন তাঁর ব্যর্থতা ভোলার অনুষঙ্গ। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া ঋত্বিকের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’-তে ছন্নছাড়া, মাতাল বুদ্ধিজীবী ‘নীলকণ্ঠ বাগচী’র চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের কথাই বলে গেছেন। ছবিটিতে নিজের রাজনৈতিক মতবাদও দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। এই ছবির পরেই তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। আগেও তিনি মানসিক অবসাদে ভুগতেন। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। ঋত্বিক পরিবার-পরিজন আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের চিনতে পারতেন, তবে অসুস্থতার কারণে মাঝেমধ্যেই মারমুখী হয়ে উঠতেন। জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালের নির্জন প্রকোষ্ঠে।
সীমাহীন অসহায়ত্বের মাঝে ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মারা যান ঋত্বিক কুমার ঘটক। ঋত্বিকের সিনেমা, সংলাপ এবং স্থিরচিত্র তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রচুর সাধারণ মানুষকে সিনেমাপাগল করে তুলেছে। ঋত্বিকের ছবিতে গানের ব্যবহার, চরিত্রগুলোর বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার যুগলবন্দি, ভাটিয়ালি থেকে ক্লাসিক্যাল, দোতারা থেকে সানাই, আর্তচিৎকার থেকে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ—এই সবই যেন তারপর থেকে ঢুকে গেছে বাংলা সিনেমার কাঠামোয়। ঋত্বিক থেকে যান প্রতিদিন অবিভক্ত বাংলার কাণ্ডারি প্রেমিক হয়ে। তিনি সময়কে কখনও গ্রাহ্য করেননি। ঋত্বিক মানুষের কথা বলতে গিয়ে প্রায় বদলেই দিয়েছিলেন বাংলা ছবির ব্যাকরণ।




