দিব্যেন্দু ঘোষ: একুশে সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হল আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। বিশ্ববাসীর গভীর বেদনাবোধ এবং বুকভরা আশার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। চারপাশে তাকালে আজ মন অজানা আতঙ্কে শিউরে ওঠে। গোটা পৃথিবীটাই যেন আজ বিশাল বারুদখানা। ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুদ্যান, কিংবা পৃথিবীর নানা কোণে প্রতিনিয়ত বেজে চলা যুদ্ধের দামামা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবসভ্যতা আজ চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এই অশান্ত ও ক্ষতবিক্ষত সময়ে দাঁড়িয়ে আপামর মানুষের আজ একটাই প্রার্থনা, যুদ্ধের এই কালো ছায়া কেটে যাক, পৃথিবীর বুকে নেমে আসুক চিরকল্যাণময় শান্তির স্নিগ্ধ সুবাতাস।
যুদ্ধ কোনও দিন কোনও সমাধান বয়ে আনে না। যুদ্ধ মানেই তো নিছক ধ্বংসলীলা, স্বজন হারানো বুকফাটা কান্না, আর ছাইচাপা অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর পঙক্তি মনে পড়ে যায়— ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’। অথচ আজকের এই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছে শৈশব। সাম্রাজ্যবাদের লোভ, আধিপত্য বিস্তার আর অস্ত্র ব্যবসার রমরমা বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে কোটি কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে। বিদেশি শক্তি অস্ত্র বিক্রির মুনাফা গুনতে ব্যস্ত, আর অন্যদিকে বোমা আর কামানের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে মায়ের কোল, গুঁড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের তিল তিল করে গড়া স্বপ্ন।
আজকের এই দিনে আমাদের মনে পড়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য ও শান্তির অমিয় বাণী। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে, ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে, জাতপাতের দেওয়াল ভেঙে আমাদের এক হওয়ার সময় এসেছে। শান্তির শ্বেতকপোত আজ খাঁচাবন্দি; তাকে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। শান্তির সুবাতাস যেন প্রতিটি কুঁড়েঘরে এবং প্রাসাদে সমানভাবে পৌঁছতে পারে, সেই পবিত্র ব্রত আজ আমাদের নিতে হবে। অপশক্তিধর দেশগুলি সামরিক খাতে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ অপচয় করে, তার সামান্য অংশ যদি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসায় বিনিয়োগ করা হত, তবে এই পৃথিবীটাই স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠতে পারত। জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত এ বছরের প্রতিপাদ্য— ‘শান্তিতে বিনিয়োগ করুন, সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন’, আজকের এই বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এই পৃথিবীর করুণ রূপের দিকে তাকিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে ধানসিঁড়ি নদীর ধারে নরম ঘাসে পা রেখে শান্তিতে বেঁচে থাকা যায়। আজ মানুষ একটু শান্তিতে ঘুমোতে চায়, একটু নিরাপদ নিঃশ্বাস নিতে চায়। কোনও মা যেন তার সন্তান হারানোর ভয়ে বুক চাপড়ে না কাঁদে। শৈশব যেন বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন না হয়ে যায়। প্যালেস্তাইনের মাটিতে আজ নিরপরাধ মানুষের রক্তে নদী বয়ে যাচ্ছে। মায়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আজ শরণার্থী হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে শান্তির বাণী আজ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
শান্তির ধারণাটি যতক্ষণ না সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনুশীলনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ এটি বিমূর্তই থেকে যাবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে, পরিবারে এবং শিক্ষালয়ে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। কূটনীতি আর সংলাপের টেবিলেই হোক সমস্ত দ্বন্দ্বের অবসান। অহঙ্কার, প্রতিহিংসা আর ক্ষমতার লড়াই ভুলে বিশ্বনেতারা যদি এক টেবিলে বসেন, তবেই মানবজাতির সত্যিকারের কল্যাণ সাধিত হতে পারে।
আজকের এই পবিত্র দিনে আমাদের এগিয়ে এসে সবাই মিলে হিংসা-দ্বেষ, অহঙ্কার আর ক্ষমতার লোভ বিসর্জন দিয়ে ভালবাসার চাদরে ঢেকে দিতেই হবে এই ধরিত্রীকে। শান্তি বিলাসিতা নয়, মানুষের বেঁচে থাকার জন্মগত ও মৌলিক অধিকার। অস্ত্র নয়, মানুষের জয় হোক; যুদ্ধ নয়, শান্তি হোক আমাদের একমাত্র সঙ্কল্প। পৃথিবীর বুকে আবার ফুটুক হাসির ফুল, ঘুচে যাক সব অন্ধকার। শান্তির শ্বেতকপোতের কলতানে মুখরিত হোক বসুন্ধরার আকাশ, চিরতরে অবসান ঘটুক সকল মানবীয় ট্র্যাজেডির।