ফের ফিরলেন তিনি। ব্রাজিলের রাজনীতিতে লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রত্যাবর্তন অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঘটনা। দুর্নীতির দায়ে জেল খাটা প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের ফের দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে বিরল। চতুর্থবারের জন্য প্রেসিডেন্ট লুলা। তাঁর এই জয় ব্রাজিলের রাজনৈতিক গতিপথের বিশাল মোড়বদল। একসময় সাধারণ ধাতু শ্রমিক থেকে দেশের জনপ্রিয়তম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তিনি। এরপর দুর্নীতির অভিযোগে জেল এবং সব শেষে আবার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন। বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন লুলা।
লুলার এই জয়ের পিছনে মূলত বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর চরম ব্যর্থতা দায়ী। বিতর্কে ঘেরা বলসোনারোর শাসনকাল। কোভিড মহামারি মোকাবিলায় তাঁর চূড়ান্ত অবহেলা ও উদাসীনতা দেশবাসী মেনে নিতে পারেনি। মহামারিতে প্রায় সাত লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ব্রাজিলে। এর পাশাপাশি ছিল লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। বেকারত্ব বাড়ে। আমাজন জঙ্গল ধ্বংসের হার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। এই চরম অব্যবস্থার মধ্যে মানুষ নির্ভরযোগ্য মুখ খুঁজছিল। লুলার ট্র্যাক রেকর্ড তাঁর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রাজিলের অর্থনীতিকে মজবুত করেছিলেন। তাঁর ‘বোলসা ফামিলিয়া’ সামাজিক প্রকল্পের হাত ধরে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠে এসেছিল। মানুষ অনিশ্চয়তার বদলে সেই চেনা ও পরীক্ষিত নেতার উপরেই ফের ভরসা রেখেছে।
ব্রাজিলের সমাজ আজ আড়াআড়ি বিভক্ত। এবারের নির্বাচন ছিল মূলত কট্টর ডানপন্থী ও বামপন্থী আদর্শের সরাসরি স্নায়ুযুদ্ধ। বলসোনারো ছিলেন চরম কট্টরপন্থী। তাঁকে বলা হত ‘ট্রপিক্যাল ট্রাম্প’। তিনি দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর বারবার আক্রমণ শানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন, সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট, সবাইকে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করান। এই কট্টরপন্থা ও বিভাজনের রাজনীতি মধ্যপন্থীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। লুলা এই রাজনৈতিক শূন্যস্থান নিপুণভাবে কাজে লাগান। তিনি শুধুমাত্র বামপন্থীদের নেতা হিসেবে প্রচার করেননি। তিনি নিজেকে গণতন্ত্র রক্ষার মুখ হিসেবে তুলে ধরেন। বিভিন্ন দলের সঙ্গে বিশাল জোট বাঁধেন। মানুষের কাছে তিনি এই বার্তা পৌঁছে দেন যে, বলসোনারোর শাসনকাল দেশকে একনায়কতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভোটাররা ফ্যাসিবাদী আচরণের বদলে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতেই লুলাকে বেছে নিয়েছেন।
লুলার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা। তাঁর আগের শাসনকালের মতো এখন আর বিশ্ববাজারে পণ্যের চড়া দাম নেই। কোভিড-পরবর্তী অর্থনীতি বেশ দুর্বল এবং সরকারের কোষাগারে টান রয়েছে। লুলা প্রচারের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দেশ থেকে ক্ষুধা, বেকারত্ব ও বৈষম্য দূর করার। কিন্তু সামাজিক কল্যাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে গেলে রাজকোষ ঘাটতি বাড়বে। বিনিয়োগকারীরা এই আর্থিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে চিন্তিত। লুলা তাই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে চাইছেন। তিনি আধুনিক বাজার অর্থনীতিকে পুরোপুরি অস্বীকার না করেই গরিব মানুষের জন্য সামাজিক প্রকল্পগুলো চালাতে চান। পরিকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানে তিনি জোর দিচ্ছেন। দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রশাসন দিতে পারলে ব্রাজিল ধীরে ধীরে আর্থিক উন্নতির পথে ফিরতে পারে।
লুলা জিতলেও তাঁর আগামী দিনের পথ মোটেই মসৃণ নয়। বলসোনারো হারলেও তাঁর কট্টর সমর্থকরা সহজে হার মানতে রাজি নন। সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হল দেশের কংগ্রেস বা সংসদ। ব্রাজিলের সংসদে এখন ডানপন্থীদের একচেটিয়া আধিপত্য। বলসোনারোর লিবারেল পার্টি এবং তাদের মিত্ররা নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ, দু’জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে। ফলে লুলা চাইলেই তাঁর পছন্দমতো আইন সহজে পাশ করাতে পারবেন না। পদে পদে তাঁকে বিরোধী সাংসদদের কড়া প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে। তাঁকে প্রতিনিয়ত আপস করে চলতে হবে। মধ্যপন্থী ও ডানপন্থীদের একাংশের সঙ্গে রফা করেই সরকার চালাতে হবে তাঁকে। তাই দেশের রাজনীতি রাতারাতি শান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে লুলা অত্যন্ত দক্ষ ও আপসকামী রাজনীতিক। তিনি চরম সংঘাত এড়িয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।
লুলার জয় বিশ্ব রাজনীতিতে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। লাতিন আমেরিকায় বামপন্থীদের ‘পিঙ্ক টাইড’ বা গোলাপি ঢেউ আবারও শক্তিশালী হল। কলম্বিয়া, চিলি, পেরুর পর ব্রাজিলেও বামেদের জয় এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যের সমীকরণ বদলে দিল। সবচেয়ে বড় নীতিগত পরিবর্তন আসবে পরিবেশ সুরক্ষায়। বলসোনারোর আমলে আমাজন ধ্বংস নিয়ে গোটা বিশ্ব উদ্বিগ্ন ছিল। লুলা জিরো ডিউফরেস্টেশন বা শূন্য বন উজাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকার সঙ্গে ব্রাজিলের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দ্রুত উন্নত হবে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন লুলার জয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, কারণ বলসোনারো ছিলেন ট্রাম্পের মিত্র। আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ব্রাজিল আবার গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা নেবে। এছাড়া চিনের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক আরও মজবুত হবে। চিন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। লুলা চাইবেন বিশ্ব রাজনীতিতে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর আওয়াজ আরও জোরালো করতে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার জয়ের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে লুলাকে শুভেচ্ছা জানান তিনি। একই সঙ্গে ভারত ও ব্রাজিলের মধ্যে বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর ও বিস্তৃত করার আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। মোদি লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধু, প্রেসিডেন্ট লুলাকে তাঁর বিপুল ভোটে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন। ভারত-ব্রাজিলের বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করতে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য আমি উন্মুখ।‘ প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, দুই দেশ একসঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করবে।
পাশাপাশি, গ্লোবাল সাউথের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যেও ভারত ও ব্রাজিল একযোগে কাজ করবে বলে আশাপ্রকাশ করেন তিনি। সাধারণভাবে ভারত ও ব্রাজিলের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত সুদৃঢ়। উভয় দেশই গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের শক্তিশালী প্রতিনিধি। লুলা দা সিলভা তাঁর আগের মেয়াদে ভারতের সঙ্গে গভীর কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। মনমোহন সিংয়ের আমলে ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ‘ইবসা’ জোট গঠিত হয়েছিল। ব্রিকস জোটের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যেও লুলা অন্যতম। নতুন মেয়াদে ভারত-ব্রাজিল সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে কৃষি, জৈব জ্বালানি এবং ওষুধ শিল্পে দুই দেশের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত বর্তমানে পেট্রোলে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। ব্রাজিল এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম পথিকৃৎ দেশ। তারা ভারতকে এই বিষয়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের স্বার্থ এক। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিতে ভারত এবং ব্রাজিল দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী। উভয় দেশই জি-৪ ভুক্ত দেশ এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিদার। লুলা এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের বড় শরিক হবেন। বলসোনারোর আমলেও ভারতের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক ভাল ছিল, তবে লুলার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি উদার ও বহুপাক্ষিক। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নেতা হিসেবে ভারত বিশ্বমঞ্চে যে অবস্থান তৈরি করতে চাইছে, লুলা সেখানে বিশ্বস্ত বন্ধু হতে পারেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, খাদ্য সুরক্ষা এবং বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আগামী দিনে নয়াদিল্লি ও ব্রাসিলিয়ার মধ্যে নতুন, শক্তিশালী ও কার্যকর রসায়ন দেখা যাবে।




