দিব্যেন্দু ঘোষ: ভারতের লৌকিক ও জনজাতি সংস্কৃতির ইতিহাসে করম উত্সব শুধুই সামাজিক আচার বা কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানমাত্র নয়; এটি প্রকৃতি এবং মানুষের সহাবস্থানের শাশ্বত দলিল। ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে পালিত এই পুজো মূলত ধরিত্রী মাতার উর্বরতা, সুস্বাস্থ্য, অরণ্য সংরক্ষণ এবং মানবজীবনের কল্যাণ কামনায় নিবেদিত। সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাওঁ, কুড়মি ও মাহাতো সহ বিভিন্ন জনজাতির প্রাণের উৎসব এই করম। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জঙ্গলমহল তথা বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই করম উৎসব যে উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক ক্যানভাস তৈরি করেছে, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক অধ্যায়। সংস্কৃতি আজ কীভাবে রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, তা পুরুলিয়ার মাটি থেকে নবান্নের করিডর পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
করম পুজোর মূল কেন্দ্রবিন্দু করম গাছের ডাল। জনজাতি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই গাছ জীবনের প্রতীক, যা সুখ-সমৃদ্ধি ও ভাল ফসলের আশীর্বাদ নিয়ে আসে। অবিবাহিত বোনেরা ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় এবং ভাল ফসলের আশায় এই ব্রত পালন করেন। মাদল, ঢাকের বোল এবং ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নাচের ছন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে জঙ্গলমহল। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড় ও বিহারের বিশাল অংশ জুড়ে এই উৎসব উদযাপিত হয়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং উত্তরবঙ্গের চা বাগান অঞ্চলগুলিতে করম উৎসব গণউৎসবের রূপ নেয়।
রাজ্য সরকার করম পুজো উপলক্ষে পূর্ণদিবস সরকারি ছুটি ঘোষণা করায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারি দফতর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং চা বাগানগুলিতে এই ছুটি কার্যকর করার পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী সামাজিক-রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি। আদিবাসী এবং কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এই দিনটিকে সরকারি ছুটির স্বীকৃতি দেওয়ার। অতীতে জঙ্গলমহলে ভাষার স্বীকৃতি (কুড়মালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা) এবং এসটি তালিকাভুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করে রেল-পথ অবরোধ ও বন্ধের মতো তীব্র আন্দোলন এবং সংঘাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠত জঙ্গলমহল। সেই সংঘাতের পথ থেকে জনজাতি সমাজকে উৎসবমুখর সামাজিক পরিসরে ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়ে আবেগকে নিজেদের অনুকূলে টানতে শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষই এখন তৎপর।
পুরুলিয়ার টামনার কড়াডি ময়দানে আদিবাসী কুড়মি সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত হতে চলেছে ঐতিহাসিক করম পর্বতিয়া মহা জুড়ুআহি উৎসব। এই মহা-অনুষ্ঠান ঘিরে জঙ্গলমহলের রাজনীতির পারদ চরমে। এই মেগা উৎসবে যোগ দিচ্ছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি এই মঞ্চে ভিনরাজ্যের হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি জঙ্গলমহলের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই উৎসবকে জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাজ্যগুলির রাজনৈতিক সমীকরণকে জোরালোভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। জঙ্গলমহলের প্রায় ৩০ থেকে ৫২ শতাংশ মানুষ কুড়মি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামের বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে এই জনজাতি ভোটব্যাঙ্কই যে কোনও রাজনৈতিক দলের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। আগের নির্বাচনগুলিতে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক পালাবদল দেখা গেছে। ফলে ২০২৬-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ভোটব্যাঙ্ক নিজেদের কব্জায় রাখতে মরিয়া সমস্ত শিবির।
অতীতে আন্দোলনের নামে জঙ্গলমহলে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তাকে সাংস্কৃতিক ধারায় রূপান্তরিত করার এই প্রচেষ্টার পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল। একদিকে বন্ধ-অবরোধের সংঘাত এড়িয়ে উৎসবের মাধ্যমে জনমানসে ইতিবাচক বার্তা পাঠানো, অন্যদিকে কুড়মি ও আদিবাসী সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সব মিলিয়ে করম উৎসব আজ পরিণত হয়েছে ক্ষমতার রমরমা আখড়ায়। করম উৎসবের শেকড় যতই মাটির গভীরে এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকুক না কেন, আজকের দিনে তার ডালপালা বিস্তার করেছে সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে। জঙ্গলমহলের রুক্ষ মাটিতে মাদলের তালের সঙ্গে মিশে গেছে ক্ষমতার পালাবদলের হিসাব-নিকাশ। প্রশাসনিক ছুটি ঘোষণা থেকে শুরু করে মেগা উৎসবে নেতামন্ত্রীদের ভিড়, সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে, জঙ্গলমহলের মন জয় না করলে বাংলার মসনদ দখল অধরা থেকেই যায়। করম উৎসব তাই আজ কেবল ভাদ্র মাসের একাদশী তিথির লৌকিক আচার নয়, এটি বাংলার রাজনীতিতে টিকে থাকার ও আধিপত্য বিস্তারের অপরিহার্য চাবিকাঠি।