কলকাতা: অন্যায় চোখের সামনে ঘটছে, অথচ প্রতিবাদ করার বদলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ! কেউ দেখেও দেখছে না, কেউ শুনেও শুনছে না। চারপাশে এত মানুষের ভিড়, তবু বিপদের মুহূর্তে একজন নারী কি সত্যিই একা? সমাজের এই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে সাদাঙ্গা দুর্গোৎসব সমিতি। তাদের এবারের ভাবনা ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’। নামের মধ্যে রয়েছে ব্যঙ্গ, আর সেই ব্যঙ্গের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে সমাজের প্রতি এক গভীর প্রশ্ন নারীদের বিরুদ্ধে অন্যায় যখন ঘটে, তখন প্রতিবাদীর ভূমিকা না নিয়ে নীরব দর্শক হয়ে থাকাটাও কি এক ধরনের দায় এড়িয়ে যাওয়া নয়?
দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক, অশুভের বিনাশ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা। অথচ বাস্তবের পৃথিবীতে নারীদের নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আজও বারবার সামনে আসে। এই বৈপরীত্যকেই শিল্পের ভাষায় তুলে ধরতে চায় সাদাঙ্গার মণ্ডপ। এখানে পুজোর আনন্দের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সামনে হাজির হয় এমন এক বাস্তবতা, যা এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।
হুতোম প্যাঁচার চোখে সমাজের মুখোশ
বাংলা সাহিত্যে হুতোম প্যাঁচা নামটি মনে করিয়ে দেয় সমাজের অসংগতি, ভণ্ডামি ও দ্বিচারিতাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরার ঐতিহ্য। সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে আশ্রয় করেই ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ থিমটি যেন দর্শকদের সামনে আয়না ধরে। সেই আয়নায় শুধু অপরাধের ছবি দেখা যায় না, দেখা যায় অপরাধের পর সমাজের প্রতিক্রিয়াও।
কোনও নারী নির্যাতনের শিকার হলে কিংবা তাঁর সঙ্গে অন্যায় ঘটলে চারপাশের মানুষের ভূমিকা কী হয়? অনেকেই সহানুভূতি প্রকাশ করেন, কেউ সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান, আবার কেউ ঘটনাটি দেখেও নীরব থাকেন। কখনও লোকলজ্জার ভয়, কখনও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, কখনও আবার ‘এটা আমার বিষয় নয়’ এই মানসিকতাই প্রতিবাদের পথ আটকে দেয়। ফলে অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
হুতোম প্যাঁচার ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে এই নীরবতার সংস্কৃতিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, অপরাধীর দায় অপরাধীরই, কিন্তু অন্যায়ের সামনে সমাজের নিষ্ক্রিয়তা ভুক্তভোগীর একাকিত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
দেবী দুর্গার আরাধনা, অথচ নারীর নিরাপত্তা কোথায়?
দুর্গাপুজোর সময় আমরা শক্তির আরাধনা করি, দেবীকে সম্মান জানাই। কিন্তু সেই সম্মানের প্রতিফলন কি প্রতিদিনের আচরণে দেখা যায়? এই প্রশ্নই থিমটির সামাজিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা শুধু উৎসবের মণ্ডপে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা ফুটে উঠতে হবে বাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে।
নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রতিবাদ করা, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ন্যায়বিচারের দাবি তোলা, এসবই একটি সচেতন সমাজের দায়িত্ব। অবশ্য প্রতিবাদের অর্থ নিজের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে ফেলা নয়; পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশ, প্রশাসন ও উপযুক্ত সহায়তা ব্যবস্থার দ্বারস্থ হওয়াও জরুরি।
পুজোর মণ্ডপ যখন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা
কলকাতার দুর্গাপুজো দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক ও সমসাময়িক বিষয়কে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সেই ধারায় সাদাঙ্গা দুর্গোৎসব সমিতির ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ দর্শকদের শুধু মণ্ডপ দেখতে নয়, নিজেদের ভূমিকা নিয়েও ভাবতে আহ্বান জানায়।
একটি থিম তখনই সার্থক হয়ে ওঠে, যখন তার বার্তা মণ্ডপের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মনে থেকে যায়। নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রশ্নে নীরবতা ভাঙা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানো এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করা, এই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে সেই সামাজিক দায়বদ্ধতাই।
সব মিলিয়ে, সাদাঙ্গার এই পুজোর ভাবনা মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো শুধু আলোর উৎসব নয়, অন্ধকারকে চিনে নেওয়ারও উপলক্ষ। দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি যদি আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করতে পারি, তবেই শক্তির বন্দনা বাস্তব জীবনে অর্থবহ হয়ে উঠবে। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায় অন্যায় যখন চোখের সামনে ঘটে, তখন আমরা প্রতিবাদী হব, নাকি নীরব দর্শক হয়েই থাকব?





