কলকাতা: যে খবরের কাগজ সকালে হাতে নিয়ে পড়া হয়, দিনের শেষে অনেক সময় সেটাই জমে থাকে ঘরের এক কোণে। পুরনো হলে তার ঠাঁই হয় ভাঙারির দোকানে, কিংবা সোজা চলে যায় আবর্জনার স্তূপে। কিন্তু ফেলে দেওয়ার আগে একবারও কি ভেবে দেখেছি, এই কাগজ দিয়েই তৈরি হতে পারে শিল্পের এক অনন্য জগৎ? সেই ভাবনাকেই বাস্তবের রূপ দিতে উদ্যোগী হয়েছে বাগুইআটির রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাব। তাদের ৭৩তম দুর্গাপুজোয় পুনর্ব্যবহৃত খবরের কাগজ দিয়ে মণ্ডপ সাজানোর অভিনব পরিকল্পনা পরিবেশ সচেতনতার বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। এবারের ভাবনা ‘কোলাজ’ যেখানে বাতিল হয়ে যাওয়া কাগজও পেতে পারে নতুন জীবন, নতুন পরিচয়।
আবর্জনা নয়, শিল্পের উপকরণ
প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাগজ ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। সংবাদপত্র, প্যাকেজিংয়ের কাগজ কিংবা পুরনো মুদ্রিত পাতার বড় অংশ পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হলেও, সচেতনতার অভাবে অনেক সময় সেগুলি বর্জ্যের সঙ্গেই মিশে যায়। বাগুইআটির এই পুজোর ভাবনা সেই চেনা অভ্যাসকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
যে কাগজের পাতায় প্রতিদিন ধরা পড়ে দেশ-বিদেশের খবর, মানুষের সুখ-দুঃখ, রাজনীতি, খেলা কিংবা বিনোদনের গল্প, সেই পাতাগুলিই এবার হয়ে উঠতে পারে দুর্গামণ্ডপের শিল্পসামগ্রী। কাগজের টুকরো, ভাঁজ, স্তর এবং বিভিন্ন অংশের সৃজনশীল বিন্যাসের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে এক অভিনব দৃশ্যজগৎ। বাতিল উপকরণের এমন ব্যবহার দেখিয়ে দেয়, শিল্প সৃষ্টির জন্য সব সময় নতুন ও দামি সামগ্রীর প্রয়োজন হয় না। কল্পনাশক্তি আর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় পুরনো জিনিসও হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণের কেন্দ্র।
‘কোলাজ’-এর ভাবনায় পরিবেশের কথা
কোলাজ শিল্পের মূল বৈশিষ্ট্য হল বিভিন্ন উপাদানকে একত্র করে একটি নতুন শিল্পরূপ তৈরি করা। আলাদা আলাদা টুকরো মিলিয়ে যেমন সম্পূর্ণ ছবি তৈরি হয়, তেমনই সমাজের ছোট ছোট উদ্যোগ একত্র হলে গড়ে উঠতে পারে পরিবেশ রক্ষার বড় আন্দোলন।
রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের এই উদ্যোগের তাৎপর্যও সেখানেই। দুর্গাপুজোর মতো জনপ্রিয় উৎসবের সঙ্গে পুনর্ব্যবহারের ধারণাকে যুক্ত করলে সেই বার্তা সহজেই পৌঁছে যেতে পারে বহু মানুষের কাছে। মণ্ডপ দেখতে আসা দর্শনার্থীরা শুধু শিল্পের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন না, বরং নিজেদের দৈনন্দিন জীবনেও বর্জ্য কমানোর কথা ভাবার সুযোগ পাবেন।
পরিবেশ রক্ষার জন্য বড় বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজন ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তন। পুরনো কাগজ আলাদা করে সংগ্রহ করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীকে কাজে লাগানো এবং অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য কমানোর মতো পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের থিম সেই সচেতনতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
৭৩ বছরের পুজোয় নতুন ভাবনার ছোঁয়া
দুর্গাপুজোর দীর্ঘ ইতিহাসে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন বরাবরই বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। কোথাও উঠে আসে বাংলার লোকসংস্কৃতি, কোথাও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, আবার কোথাও সমসাময়িক পরিবেশগত সমস্যাই হয়ে ওঠে শিল্পের মূল বিষয়। বাগুইআটির রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের ৭৩তম বর্ষের এই উদ্যোগও সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত।
দীর্ঘদিনের পুজোর ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই নতুন প্রজন্মের কাছে পরিবেশবান্ধব ভাবনাকে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এখানে। বিশেষ করে একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা যখন পরিবেশের উপর চাপ বাড়াচ্ছে, তখন পুরনো কাগজের মতো সহজলভ্য উপকরণকে শিল্পের কাজে লাগানোর ধারণা আলাদা গুরুত্ব পায়।
উৎসবের আনন্দে সবুজ ভবিষ্যতের অঙ্গীকার
দুর্গাপুজো মানেই আলোর উৎসব, মানুষের মিলন, শিল্পের উদ্যাপন এবং নতুন করে আনন্দ খুঁজে পাওয়া। সেই আনন্দের সঙ্গে যদি পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও জুড়ে যায়, তবে উৎসবের অর্থ আরও গভীর হয়ে ওঠে।
বাগুইআটির রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের ‘কোলাজ’ ভাবনা সেই সম্ভাবনার কথাই তুলে ধরে। পুরনো খবরের কাগজকে নতুন রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, কোনও জিনিসের ব্যবহার শেষ হয়ে গেলেই তার মূল্য শেষ হয়ে যায় না। সঠিক পরিকল্পনা ও সৃজনশীলতায় সেটিই হয়ে উঠতে পারে নতুন সৃষ্টির উপাদান।
বাগুইআটির এই পুজোয় কাগজের পাতায় পাতায় শুধু শিল্পের গল্প নয়, লুকিয়ে রয়েছে পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তাও। মণ্ডপের প্রতিটি পুনর্ব্যবহৃত উপাদান যেন দর্শনার্থীদের মনে একটি প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে আমরা কি ফেলে দেওয়া জিনিসকে নতুন করে ব্যবহার করার সুযোগ দিচ্ছি? কারণ, প্রকৃতির ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াইয়ে কখনও কখনও সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একটি পুরনো খবরের কাগজ থেকেই।





