কলকাতা: দুর্গাপুজো মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাবেকি মাটির প্রতিমা, শোলার সাজ, ডাকের অলংকার আর ঢাকের তালে উৎসবের আবহ। কিন্তু শিল্পের ভাষা যখন চিরাচরিত রীতির বাইরে গিয়ে দেবী দুর্গাকে নতুনভাবে তুলে ধরে, তখন সেই সৃষ্টিই হয়ে ওঠে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। আলিপুরের এক পারিবারিক দুর্গাপুজোয় এবার তেমনই ব্যতিক্রমী ভাবনার দেখা মিলেছে। মাটির প্রতিমার বদলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রশিল্পের মাধ্যমে ছয় ফুটের দেবীমূর্তি তুলে ধরেছেন শিল্পী হ্যালি গোস্বামী। পরিবারের পুজোর ২৫তম বছরে এই শিল্পনির্ভর উদ্যোগে মিশেছে ভক্তি, লোকশিল্প এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য।
পটচিত্রের ক্যানভাসে দেবী দুর্গা
বাংলার পটচিত্র কেবল একটি চিত্রশিল্পের ধারা নয়, এটি গ্রামবাংলার ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পটের পরতে পরতে ফুটে ওঠে নানা কাহিনি, পৌরাণিক আখ্যান, দেবদেবীর রূপ এবং মানুষের জীবনযাপনের ছবি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পটুয়াদের হাতে এই শিল্প বেঁচে রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকেই দুর্গাপুজোর কেন্দ্রে নিয়ে এসে শিল্পী হ্যালি গোস্বামী তৈরি করেছেন এক অন্যরকম আবহ।
সাধারণত দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দর্শনার্থীরা মাটির তৈরি প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে দেবীর রূপ দর্শন করেন। কিন্তু পটচিত্রের মাধ্যমে দেবীকে তুলে ধরার ভাবনা দর্শকদের সামনে খুলে দেয় অন্য এক শিল্পজগৎ। এখানে তুলির টান, রেখার বিন্যাস, রঙের ব্যবহার এবং চিত্রের অলংকরণ হয়ে ওঠে দেবীর রূপ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। প্রতিমা নির্মাণের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এই শিল্পভাবনা প্রমাণ করে, আরাধনার প্রকাশ একটিমাত্র মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়।
পরিবারের পুজোর ২৫ বছরে বিশেষ উপহার
একটি পারিবারিক দুর্গাপুজো শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের স্মৃতি, প্রজন্মের বন্ধন এবং পরিবারের নিজস্ব সংস্কৃতি। পুজোর ২৫তম বছর তাই যে কোনও পরিবারের কাছে একটি বিশেষ মাইলফলক। এমন একটি উপলক্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে শিল্পের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার উদ্যোগ পুজোয় যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা।
আলিপুরের এই পারিবারিক পুজোয় পটচিত্রের ব্যবহার সেই বিশেষ মুহূর্তকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলার নিজস্ব শিল্পধারাকে সামনে রেখে উৎসব পালন করার মধ্যে রয়েছে শিকড়ের প্রতি টান এবং ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা।
মাটির প্রতিমার বাইরেও রয়েছে শিল্পের বিস্তৃত জগৎ
দুর্গাপুজোর সঙ্গে মৃৎশিল্পের সম্পর্ক বহু প্রাচীন। কুমোরটুলির শিল্পীদের হাতে তৈরি প্রতিমা বাংলার শিল্পঐতিহ্যের অন্যতম পরিচয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজোর শিল্পভাবনায় এসেছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কখনও কাঠ, কখনও ধাতু, কখনও পরিবেশবান্ধব উপকরণ, আবার কখনও চিত্রকলার মাধ্যমেও দেবী দুর্গাকে তুলে ধরা হচ্ছে।
পটচিত্রে দেবীর রূপ ফুটিয়ে তোলার এই উদ্যোগ সেই বহুমাত্রিক শিল্পচর্চারই একটি উদাহরণ। এর মাধ্যমে বাংলার লোকশিল্প নতুন একটি পরিসর পায়। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের কাছেও পরিচিত হয় এমন এক শিল্পরীতি, যা দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
ভক্তি, ঐতিহ্য ও লোকশিল্পের মেলবন্ধন
দুর্গাপুজোর সৌন্দর্য কেবল প্রতিমার আকার বা মণ্ডপের জাঁকজমকে নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত ভাবনাতেও। আলিপুরের এই পুজোর বিশেষত্ব হল, পরিবারের রজতজয়ন্তী বর্ষে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রকে আরাধনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে তেমনই গুরুত্ব পেয়েছে বাংলার লোকশিল্পের সংরক্ষণ ও প্রচারের ভাবনা।
সব মিলিয়ে, মাটির প্রতিমার পরিচিত রীতির বাইরে ছয় ফুটের পটচিত্রে দেবী দুর্গার এই উপস্থাপনা আলিপুরের পারিবারিক পুজোকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়। পরিবারের ২৫ বছরের যাত্রায় এটি নিছক একটি নতুন শিল্পপ্রয়াস নয়; বরং বাংলার ঐতিহ্যকে ভালোবাসা, তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক সৃজনশীল প্রচেষ্টা।





