কলকাতা: মাটির উপরে আমাদের চেনা পৃথিবী, আর মাটির গভীরে লুকিয়ে রয়েছে কত না বলা ইতিহাস! সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া জনপদ, ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকা সভ্যতা কিংবা একদিন প্রাণের স্পন্দনে ভরা অথচ আজ বিস্মৃত কোনও গ্রাম, কল্পনার সেই রহস্যময় জগৎকেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করেছে বৈষ্ণবঘাটা-পাটুলি উপনগরী সর্বজনীন। এ বছরের ভাবনা ‘অন্তর্লীন’। নামেই রয়েছে রহস্যের ইঙ্গিত, আর সেই রহস্যের পথ ধরেই দর্শনার্থীদের সামনে খুলে যায় ইতিহাস, প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্বের এক অন্যরকম আখ্যান।
দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবী দর্শন, আলোর রোশনাই কিংবা চোখধাঁধানো শিল্পকলা নয়। কখনও কখনও একটি মণ্ডপ হয়ে উঠতে পারে ভাবনার দরজা, যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে পরিচিত পৃথিবীকেও নতুন করে চিনতে ইচ্ছে করে। পাটুলির ‘অন্তর্লীন’ যেন সেই ভাবনারই এক শিল্পিত প্রকাশ। এখানে মাটির নীচে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার কল্পিত অনুসন্ধানের সঙ্গে মিশে রয়েছে মানুষের জীবনযাপন, প্রকৃতির পরিবর্তন এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।
মাটির নীচে কোন ইতিহাসের সন্ধান?
কল্পনার ক্যানভাসে উঠে এসেছে তিনটি গ্রাম। একসময় যেখানে মানুষের বসতি ছিল, ছিল জীবনযাত্রার পরিচিত ছন্দ, আজ সেই জনপদগুলিই যেন সময়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়। মাটির স্তরের নীচে চাপা পড়ে থাকা অতীতের সেই চিহ্ন খুঁজতে গিয়ে দর্শনার্থীদের মনে জেগে উঠতে পারে একের পর এক প্রশ্ন,কীভাবে হারিয়ে যায় একটি সভ্যতা? প্রকৃতির পরিবর্তন কি মানুষের বসতিকে মুছে দিতে পারে? নাকি মানুষের অবহেলা ও সময়ের নির্মমতাই ইতিহাসকে ক্রমশ অদৃশ্য করে দেয়?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর সরাসরি বলে দেওয়ার বদলে ‘অন্তর্লীন’ দর্শকদের ভাবনার জগতে নিয়ে যেতে চায়। প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের আবহে গড়ে ওঠা এই ভাবনা মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের চারপাশের মাটি, নদী, জলাশয় এবং হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতির মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে অতীতের নানা ইঙ্গিত।
জলের সংকট, সভ্যতার সংকট
এই থিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক জলের সংকট। জল ছাড়া জীবন অসম্ভব, আর জলকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বহু প্রাচীন সভ্যতা। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জলসম্পদের অভাব কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া—এমন নানা বিষয় মানুষের বসতি ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। ‘অন্তর্লীন’-এর ভাবনায় জলের প্রসঙ্গ তাই নিছক একটি দৃশ্যগত উপাদান নয়; এটি বর্তমান সময়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
আজ যখন জল সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার এবং পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন হারিয়ে যাওয়া জনপদের কল্পকাহিনি দর্শনার্থীদের সামনে নতুন করে সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। অতীতের কোনও সভ্যতা হারিয়ে যাওয়ার গল্প শুনতে শুনতে হয়তো মনে পড়ে যায় বর্তমান পৃথিবীর কথাও। আজকের অবহেলা ভবিষ্যতের ইতিহাসে কীভাবে লেখা থাকবে, সেই প্রশ্নও উঁকি দেয় মনে।
দুর্গাপুজোয় শিল্পের সঙ্গে ভাবনার মেলবন্ধন
কলকাতার দুর্গাপুজো বরাবরই শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক বার্তার এক অনন্য মঞ্চ। বড় বড় মণ্ডপের প্রতিযোগিতায় যখন দর্শনার্থীদের চোখ আটকে যায় নান্দনিক নির্মাণে, তখন ‘অন্তর্লীন’-এর মতো ভাবনা পুজো দর্শনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে। এখানে আকর্ষণ শুধু মণ্ডপের চেহারায় নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত গল্পে।
মাটির নীচে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা, কল্পিত তিনটি গ্রাম এবং জলের সংকট এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক বিষয়, যা রহস্যের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বৈষ্ণবঘাটা-পাটুলি উপনগরী সর্বজনীনের ‘অন্তর্লীন’ দর্শনার্থীদের সামনে এক অভিনব ভাবনার জগৎ খুলে ধরেছে। যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে আমরা প্রতিদিনের জীবন কাটাই, সেই মাটির গভীরেই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে অসংখ্য অজানা গল্প। পাটুলির এই পুজোর ভাবনা যেন সেই অদেখা অতীতের দিকেই তাকাতে শেখায়। কারণ, কখনও কখনও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের খোঁজ করতে গিয়েই আমরা নিজেদের বর্তমানকে সবচেয়ে ভালোভাবে চিনতে পারি।





