হাবিবুর রহমান, ঢাকা : বহুল চর্চিত দ্বিতীয় পক্ষের কিশোরী স্ত্রীকে আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগে সুন্দরবন ঘেঁষা বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানী ঢাকার সংসদ সদস্যদের সরকারি আবাসিক এলাকা ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে গতরাতে সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে।
মরিয়মের সঙ্গে এমপি নজরুলের বয়সের ব্যবধান ৫৭ বছর। মরিয়মের বয়স ছিল ১৯ বছর। অভিযোগ মরিয়মকে জালে ফেলে এ বিয়ে করেন এমপি সাহেব। রবিবার গভীর রাতে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে রাজধানীর শের- ই-বাংলা নগর থানায় মামলাটি করেন। এ মামলায় গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও নজরুলের শ্যালক ওবায়দুল রহমানকে আসামি করায় গ্রেপ্তারও হয়েছে। আজ সোমবার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।
গতকাল সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের (১৯) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটি গাজী নজরুলের। তিনি এই ফ্ল্যাটে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। গতকাল ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষের দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে শের-ই-বাংলা নগর থানার পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই ও ডিবির দল ঘটনাস্থলে যায়। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
মামলার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের এস এম মাসুম বিল্লাহ পেশায় একজন মুদিদোকানদার। তাঁর বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গত জুনে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের (৭৫) বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের বাসায় গাজী নজরুল তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে বসবাস করতেন। বাসায় তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদাও (৬৫) একসঙ্গে থাকেন। এজাহারভুক্ত আসামি ওবায়দুলের (৩৮) প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় এ বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও তাঁর প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক–মানসিক নির্যাতন করতেন।
নির্যাতনের বিষয়টি মরিয়ম বিভিন্ন সময় মুঠোফোনে তাঁর পরিবারকে জানাতেন। এবং নোটও করে রাখতেন।
মামলায় বলা হয়, গতকাল বিকেলের দিকে মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন গাজী নজরুল। খবর পেয়ে মরিয়মের বাবা তাঁর শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। দেখতে পান, বাসায় অনেক মানুষের ভিড়। পরে তিনি জানতে পারেন, বাসার ভেতরের রুমে গলায় ফাঁস দিয়েছেন মরিয়ম।রুমের দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল। পরে থানার পুলিশের সহায়তায় ও উপস্থিত লোকজনের মাধ্যমে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় মরিয়মের বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করি বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, চিরকুটটি মরিয়মের হতে পারে। তবে লেখাটি মরিয়মের কি না, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, সংসদ সদস্য গাজী নজরুলসহ তিন আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে কি না, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গাজী নজরুল জামাতে ইসলামির মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। পরে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম। এরপর গত ২২ জুলাই জামাতে ইসলামি গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। যদিও নজরুল দাবি করতেন তিনি জামাতের সংসদ সদস্য। লোককে দেখানোর জন্য এটা বলা হচ্ছে।