নিউজ ডেস্ক: হাটবাজারের চেনা ছবিতে চাল, ডাল, শাকসবজি কিংবা গৃহস্থালির পণ্যের বিকিকিনি নিত্যদিনের দৃশ্য। কিন্তু গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন যুবকেরা, আর পছন্দমতো দরদাম করে তাঁদের ‘কিনে’ নিচ্ছেন পাত্রীর অভিভাবকেরা এমন দৃশ্য রূপকথা নয়, একেবারে বাস্তব।
বিহারের মধুবনী জেলার সৌরথ গ্রামে বিগত প্রায় সাত শতাব্দী ধরে প্রতি বছর বসছে এমনই এক অভিনব মেলা, যা স্থানীয় ভাষায় ‘সৌরথ সভা’ নামে পরিচিত। আধুনিক ডেটিং অ্যাপ কিংবা ম্যাট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইটের যুগেও টিকে রয়েছে এই শতাব্দীপ্রাচীন পাত্রের হাট।
ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চতুর্দশ শতকে কর্নাট রাজবংশের মহারাজা হরি সিংহের হাত ধরে এই সভার সূত্রপাত। মূল উদ্দেশ্য ছিল যৌতুক প্রথার বিলোপ ঘটানো এবং স্বগোত্রীয় বৈবাহিক জটিলতা দূর করে মৈথিলী ব্রাহ্মণদের মধ্যে যোগ্য পাত্র-পাত্রীর মিলন ঘটানো। নদীঘেরা সৌরথ গ্রামের ছায়াঘন আম ও বটগাছের তলায় টানা নয় দিন ধরে চলে এই বার্ষিক জমায়েত।
দূরদূরান্ত থেকে আসা মৈথিলী ব্রাহ্মণ যুবকেরা সাবেক ধুতি-কুর্তা কিংবা আধুনিক পোশাকে এখানে হাজির হন। বহু ক্ষেত্রে পাত্রের শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরি ও পারিবারিক পরিচয় লিখে মূল্য নির্ধারণ করা থাকে। পাত্রের বয়স, রূপ এবং পেশার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় ‘দর’। সাধারণত ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দর হাঁকা হয় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। ত্রিশ পেরোলেই অবশ্য পাত্রের কদর ও মূল্য দুটোই বেশ খানিকটা কমে যায়। কনেপক্ষের অভিভাবকেরা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে পাত্র পছন্দ করেন এবং চলে সরাসরি দরদস্তুর।
তবে দরদাম চূড়ান্ত হলেই বিয়ের সানাই বাজে না। এই সভার আসল চাবিকাঠি থাকে ‘পঞ্জিকর’ অর্থাৎ বংশতালিকা বিশারদদের হাতে। তাঁদের লাল মলাটের মোটা নথিপত্র ঘেঁটে নিশ্চিত হতে হয়, পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে পিতৃসূত্রে সাত প্রজন্ম এবং মাতৃসূত্রে পাঁচ প্রজন্মের মধ্যে কোনো রক্তসম্পর্ক নেই তো! এই জিনগত বিশুদ্ধতার প্রমাণপত্র বা ‘সিদ্ধান্ত’ মেলা বাধ্যতামূলক। পঞ্জিকরের ছাড়পত্র মিললেই তবে বিয়ে বৈধ রূপ পায়; অনেকে সভার চত্বরেই মালাবদল সেরে নেন, কেউ বা ফেরেন নিজ গ্রামে।
কালের নিয়মে আজ সৌরথ সভার জৌলুস অনেকটাই ফিকে। উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন হাটে দাঁড়িয়ে পাত্র হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের বিরোধী। তা সত্ত্বেও ইতিহাস ও পরম্পরাকে ধরে রাখতে এখনও এই সভার আয়োজন করা হয়।
