নিউজ ডেস্ক: স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ হল রাজার। তিনি ভাবলেন স্ত্রী সর্বমঙ্গলা অন্য পুরুষের প্রতি অনুরক্ত। আর তাই স্ত্রীকে হত্যা করলেন তিনি। তারপরই মনের ভেতর দ্বন্দ্ব শুরু হল তাঁর। শান্তি,ঘুম সবকিছুই তলানিতে ঠেকল তাঁর। অবশেষে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হলেন তিনি। আরাধ্যা দেবী কালিকার স্তব করলেন নারীহত্যার পাপ খণ্ডন করতে।
এরপর বর্ধমানরাজ হরিশ্চন্দ্র স্বপ্নাদেশ পেলেন মাতৃমূর্তি স্থাপন করার। তিনি স্বপ্নাদেশে এও জানলেন মা কালিকা দেখা দেবেন অলৌকিক উপায়ে। একারনেই বজরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। মুক্তির খোঁজে,মা কালিকার সন্ধানে। তৎকালীন সারাপুলি গ্রামে গঙ্গার তীরে তাঁর বজরা এসে ঠেকল। সারাপুলি গ্রাম তখন রাজনগর পরগনার অন্তর্গত। এবং একই সাথে তৎকালীন এই জনপদ ছিল বর্ধমান রাজাদের আয়ত্তাধীন।
সেই রাজনগর পরগনা আজকের বর্ধিষ্ণু জনপদ শেওড়াফুলি, জেলা হুগলি। সেই জনপদ ছিল আসলে একটি গঞ্জ বা বাজার এলাকা। সেই এলাকাতে গঙ্গার ধার ঘেঁষেই তৈরি হল দেবি কালিকার মন্দির। স্ত্রী হত্যার পাপ থেকে মুক্তি বা নিস্তার পেতেই এই মন্দির নির্মাণ করেন বর্ধমানরাজ মনোহর রায়ের পুত্র হরিশ্চন্দ্র রায়। সালটা ১৮২৮,১৪৩৪ বঙ্গাব্দ। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে প্রতিষ্ঠা হল এই মন্দিরের।
হরিশ্চন্দ্র রায় স্ত্রী হত্যার পাপ থেকে মুক্তি বা নিস্তার পেতেই এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলেই মা কালিকার এই মূর্তির নাম নিস্তারিণী। দেবী এখানে দক্ষিণাকালিকা রূপে পূজিতা হন। কথিত আছে, গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে মাতৃমূর্তি সন্ধান করার সময় মন্দির সংলগ্ন ভূমিতেই মেলে একটি কষ্টিপাথরের শিলা। পণ্ডিতরা লক্ষণ দেখে এটি মাতৃমূর্তি বলে চিনতে পারেন। শুরু হয় মাতৃ আরাধনা।
এঈ মন্দিরের থামগুলি কলাগাছ আকারের। এই কারণে একে কলাগেছ্যা থাম বলে। দক্ষিণমুখী এই মন্দিরের ছাদ সমতল এবং এই মন্দির চূড়াবিহীন। এখনও বর্ধমান রাজপরিবার থেকে এই মন্দির পরিচালনা হয়। আছে ট্রাস্টি বোর্ড। যার অনুমোদিত পূজারী এবং সেবায়েতরা নিত্যসেবা করেন এই মাতৃমূর্তির। গর্ভগৃহে পঞ্চমুণ্ডির আসনে তামার অষ্টদলপদ্মে দেবী বিরাজমানা।
প্রচলিত মূর্তির থেকে এই দেবীর রূপ কিছুটা আলাদা। এখানে দেবীর হাতে খাঁড়ার পরিবর্তে রয়েছে তলোয়ার। তিনি শায়িত শিবের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। বিগ্রহটি উচ্চতায় প্রায় আড়াই থেকে তিন ফুট। মূল মন্দিরের পাশেই আছে শ্বেতপাথরের শিবলিঙ্গ। রয়েছেন মহিষমর্দিনী দশভুজা। আরও যে মূর্তি আছে তা বাঁশি হাতে শ্রীকৃষ্ণ এবং রাজা হরিশ্চন্দ্র রায়ের আদি নিবাস বর্ধমানের পাটুলি-নারায়ণপুর থেকে আনা কিছু প্রাচীন বিগ্রহের। মন্দিরে আছে একটি বড়ো এবং দুটি ছোট ঘণ্টা। যা ছাদ থেকে ঝুলন্ত।
এই মন্দিরে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে মাকে লুচিভোগ দেওয়া হয়। এখানে অন্নভোগ হয় না। বিশেষ তিথি যেমন,প্রতি অমাবস্যায় ও কালীপুজোর দিনে মন্দিরে বিশেষ পুজো ও বলি হয়। এই মন্দিরের চাতাল জূড়ে আছে বেশ কিছু দোকান এবং চালা দোকান। এগুলি মূলত খাবার, বাসনপত্র, মনোহারি, ফুলমালা এবং দশকর্মার।
কথিত আছে রানী রাসমণি এখানে পুজো দিয়ে যান। এরপরই তিনি দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিনীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। মূর্তি নির্মাণের সময় এই মূর্তিটির আদলেই ভবতারিণী মূর্তির নির্মাণ হয়েছিল। আরও জানা যায়, দাঁইহাটের এক নবীন শিল্পী তিনটি মূর্তি বানিয়েছিলেন। যার একটি শেওড়াফুলির নিস্তারিণী মাতা।
মন্দিরের সিঁড়ি পেরোলেই গঙ্গা। পতিতপাবনী,জাহ্নবী কলকল শব্দে আজও বলে চলে এক পুরোনো না হওয়া ইতিহাস। সেই ইতিহাস জুড়ে থাকে এক রাজার মনস্তাপ, এক রানির আর্তনাদ। আর মায়ের আশীর্বাদের স্পর্শে অখ্যাত এক গঞ্জ হয়ে ওঠে হাজার হাজার ভক্ত সমাগমের মিলন ক্ষেত্র, পূণ্যস্থান।




