কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: রাজ্যের বিভিন্ন বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট (জেএম) আদালতে পর্যাপ্ত সংখ্যক সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) না থাকায় মামলা পরিচালনা ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও দীর্ঘ দিন ধরে পদ খালি, কোথাও আবার অনুমোদিত সংখ্যার তুলনায় কম সরকারি কৌঁসুলি দিয়ে চলছে আদালতের কাজ। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থীদের উপর। নির্দিষ্ট সময়ে শুনানি না হওয়া, মামলার পরবর্তী তারিখ পিছিয়ে যাওয়া কিংবা সরকারি পক্ষের আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে শুনানি এগিয়ে না যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে বহু বিচারপ্রার্থীকে।
এক সময় রাজ্যের নিম্ন আদালতগুলিতে সরকারি কৌঁসুলির ঘাটতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। প্রশাসনিক স্তরে নিয়োগ ও পরিকাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই সমস্যা অনেকটাই মিটবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। বরং বিভিন্ন আদালতে ফের সহকারী সরকারি কৌঁসুলির পদ ফাঁকা থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে যে আদালতগুলিতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ফৌজদারি মামলার শুনানি হয়, সেখানে সরকারি পক্ষের আইনজীবীর অভাব কার্যত বিচারপ্রক্রিয়ার গতিকে ধাক্কা দিচ্ছে।
আদালত সূত্রের খবর, রাজ্যের একাধিক মহকুমা ও নিম্ন আদালতে অন্তত তিন থেকে চারটি করে সহকারী সরকারি কৌঁসুলির পদ থাকার কথা। কিন্তু সব জায়গায় সেই সংখ্যক আইনজীবী নেই। কোথাও অনুমোদিত পদের কয়েকটি দীর্ঘ দিন ধরে শূন্য, আবার কোথাও কোনও আইনজীবী দায়িত্ব ছাড়ার পর তাঁর জায়গায় নতুন নিয়োগ না হওয়ায় কাজের চাপ গিয়ে পড়ছে অন্য কৌঁসুলিদের উপর। ফলে এক জন সরকারি কৌঁসুলিকে একাধিক আদালত বা বিপুল সংখ্যক মামলা সামলাতে হচ্ছে।
সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে সেই সব আদালতে, যেখানে মামলার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সেখানে একাধিক এপিপি প্রয়োজন হলেও বাস্তবে অনেক সময় কম সংখ্যক আইনজীবী দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। ফলে একই দিনে একাধিক মামলার শুনানি থাকলে সরকারি পক্ষের আইনজীবীর পক্ষে প্রত্যেকটি মামলায় প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তার প্রভাব পড়ছে সাক্ষ্যগ্রহণ থেকে শুরু করে চার্জ গঠন, জামিনের শুনানি কিংবা মামলার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েও।
আবার উল্টো ছবিও রয়েছে। কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত সংখ্যক সরকারি কৌঁসুলি থাকার পরেও তাঁদের কাজের চাপ তুলনামূলক ভাবে কম। ফলে এক দিকে যখন কোনও আদালতে আইনজীবীর ঘাটতির কারণে মামলা এগোতে সময় লাগছে, অন্য দিকে অন্য আদালতে একই ধরনের পদে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সংখ্যক সরকারি কৌঁসুলি থাকার অভিযোগও উঠছে। অর্থাৎ, শুধু শূন্যপদ পূরণ নয়, আদালতভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি কৌঁসুলি বণ্টনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, বিচারপ্রক্রিয়ায় সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনও মামলায় অভিযুক্ত যেমন দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন, তেমনই অভিযোগকারী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরও দ্রুত নিষ্পত্তির প্রত্যাশা থাকে। সরকারি পক্ষের আইনজীবীর অভাবে যদি শুনানি বার বার পিছিয়ে যায়, তা হলে সেই অপেক্ষার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় বিচারপ্রার্থীকেই।
আইনজীবীদের আরও বক্তব্য, সরকারি কৌঁসুলি শুধুমাত্র আদালতে সরকারের হয়ে সওয়াল করেন না। মামলার নথি খতিয়ে দেখা, পুলিশের তদন্ত সংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা, সাক্ষীদের সঙ্গে সমন্বয়, আদালতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া—একাধিক দায়িত্ব তাঁদের উপর থাকে। ফলে পর্যাপ্ত সংখ্যক কৌঁসুলি না থাকলে একজনের উপর কাজের চাপ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। তাতে মামলার প্রস্তুতি ও শুনানির মানও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বিভিন্ন নিম্ন আদালতে দ্রুত শূন্যপদ পূরণের দাবি উঠছে। আদালতকেন্দ্রিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে কোথায় কত জন এপিপি প্রয়োজন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করে সেই অনুযায়ী নিয়োগের ব্যবস্থা করার পক্ষেই সওয়াল করছেন আইনজীবীদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, মামলার সংখ্যা বাড়ছে অথচ সেই অনুপাতে সরকারি পক্ষের আইনজীবীর সংখ্যা না বাড়ালে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি স্বাভাবিক রাখা কঠিন।
বিচারপ্রার্থীদের একাংশেরও বক্তব্য, মামলা বছরের পর বছর চলার অন্যতম কারণ শুধু আদালতের সংখ্যা বা মামলার পাহাড় নয়; প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের ঘাটতিও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তাই নিম্ন আদালতে সহকারী সরকারি কৌঁসুলির শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা গেলে এক দিকে যেমন শুনানির গতি বাড়তে পারে, তেমনই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পথও কিছুটা মসৃণ হবে। এখন নজর, রাজ্য এই অভিযোগের কতটা দ্রুত সুরাহা করে।




