নয়াদিল্লি: আকাশে তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি। সহ-পাইলটের হামলায় রক্তাক্ত হয়ে ককপিটের মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার। মাথায় গুরুতর আঘাত। শরীরের একাধিক জায়গায় ক্ষত। অথচ সেই অবস্থাতেও থামেননি তিনি। বুঝেছিলেন, বিমানটি দ্রুত নীচের দিকে নামছে। তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছিলেন তিনি। তার পরেই যাত্রী এবং বিমানকর্মীরা ভিতরে ঢুকে পরিস্থিতি সামলানোর সুযোগ পান। নিরাপদে নামানো হয় বিমানটিকে।
সেই ভয়াবহ ঘটনার পর সামনে এল স্মিতের শারীরিক অবস্থার আরও গুরুতর তথ্য। সূত্রের খবর, হামলায় তাঁর মাথার খুলি ভেঙে একটি হাড়ের টুকরো ভিতরের দিকে ঢুকে গিয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডিপ্রেসড স্কাল ফ্র্যাকচার’। সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি চিকিৎসার সময় তাঁর মাথার সেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠন করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে আবু ধাবিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ৩০ সেপ্টেম্বর। দুবাই থেকে তেল আভিভ যাচ্ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073। বিমানে ছিলেন ১৭০-র বেশি যাত্রী ও ক্রু। মাঝ আকাশে আচমকাই সহ-পাইলট ওমানের নাগরিক হামাদ আল-হাম্মামি ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের উপর হামলা করেন। অভিযোগ, ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি তাঁকে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করা হয়। এর মধ্যেই বিমানটি দ্রুত নীচের দিকে নামতে শুরু করে।
বিপদের মাত্রা বোঝা যায় বিমানের উচ্চতা দ্রুত কমে যাওয়ায়। প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা বিমানটি অস্বাভাবিক দ্রুততায় নীচে নামতে শুরু করে। জরুরি সংকেত পাঠানোর পর সেটিতে হাইজ্যাকের সংকেত ‘৭৫০০’ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কয়েক মুহূর্তের ভুলেই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারত।
তার মধ্যেই ককপিটে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলেন স্মিত। মাথা, হাত-পা, বুক এবং পেটের উপরিভাগে তাঁর একাধিক আঘাত লাগে। কিন্তু বিমানের গতিপথ যে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। নিজের প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ের মধ্যেও যাত্রীদের কথা মাথায় রেখে শেষ চেষ্টা করেন। কোনও ভাবে ককপিটের দরজা খুলে দেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে কয়েক জন যাত্রী ও বিমানকর্মী ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করার চেষ্টা করেন।
সেই সময় বিমানে থাকা কয়েক জন যাত্রীও পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে আসেন। হামলাকারীকে ককপিট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিমানে থাকা অন্য দুই পাইলট দায়িত্ব নেন। শেষ পর্যন্ত বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। বিমানে থাকা ১৭৪ জন যাত্রী এবং আট জন ক্রু নিরাপদে নামতে সক্ষম হন।
তবে তখনও স্মিতের লড়াই শেষ হয়নি। তাবুকের হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সামনে আসে মাথার গুরুতর চোট। ‘ডিপ্রেসড স্কাল ফ্র্যাকচার’-এ খুলির একটি অংশ ভেঙে ভিতরের দিকে ঢুকে যাওয়ায় দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। জরুরি চিকিৎসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে আবু ধাবিতে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেখানকার একটি সামরিক হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন তিনি। চিকিৎসা সূত্রে তাঁর শারীরিক অবস্থার ইতিবাচক উন্নতির কথা জানা গিয়েছে।
এর আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ভিডিয়ো কলে নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন স্মিত। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি তখন নিজের প্রাণের জন্য লড়ছিলেন। কিন্তু বিমানটি যখন নীচে নামছে বুঝতে পারেন, তখন মনে হয়েছিল তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে। কারণ তিনি কিছু না করলে বিমানের যাত্রীদের প্রাণহানি হতে পারে। স্মিতের সেই মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সম্ভবত বদলে দিয়েছিল ১৮০-র কাছাকাছি মানুষের ভাগ্য। গুরুতর আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার ফলে অন্যরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকানোর সুযোগ পান। পরে অন্য পাইলটরা বিমানটি নিরাপদে নামিয়ে আনেন।
ঘটনার পর স্মিত মাচ্ছারকে ‘নায়ক’ বলে প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনও তদন্তাধীন। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে সহ-পাইলটের হামলার কথা উঠে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তৃপক্ষও ঘটনার পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং এর পিছনে কোনও পূর্বপরিকল্পনা বা সন্ত্রাসবাদী যোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
আকাশে কয়েক মিনিটের সেই রক্তাক্ত লড়াই এখন স্মিত মাচ্ছারের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। মাথার খুলি ভাঙা, শরীরের একাধিক ক্ষত—তার পরেও যাত্রীদের কথা ভেবে ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার সেই মুহূর্তই তাঁকে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
