কলকাতা: বিশ্বকর্মা পুজোর প্রাক্কালে সোনাগাছিতে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়াকে ঘিরে স্বস্তির ছবি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR পর্বে পরিচয়পত্র ও পুরনো নথি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে আপাতত তেমন কোনও জটিলতার অভিযোগ সামনে আসেনি। প্রয়োজনীয় নথি থাকা যৌনকর্মী এবং এলাকার অন্যান্য যোগ্য মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রকল্পের টাকা জমা পড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ‘অন্নপূর্ণা দিবস’ পালন করা হচ্ছে। সেই আবহে সোনাগাছির যৌনকর্মীদের মধ্যেও প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছনোর খবর সামনে এসেছে। যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’ এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠন ‘আমরা পদাতিক’-এর বক্তব্য, প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা মহিলাদের টাকা পেতে এখনও পর্যন্ত বিশেষ কোনও সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে না।
‘দুর্বার’-এর শীর্ষ সংগঠক বিশাখা লস্কর জানিয়েছেন, বহু মহিলা ইতিমধ্যেই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পেয়েছেন। তাঁর দাবি, বুধবারও একাধিক মহিলার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে, যাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সন্ধ্যা ৬টার পরেও টাকা জমা পড়েছে। SIR-এর সময় যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তেমন সমস্যা দেখা যাচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
একইসঙ্গে ‘আমরা পদাতিক’-এর আইনি পরামর্শদাতা মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যাঁদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র রয়েছে, তাঁদের প্রকল্পের সুবিধা পেতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না। অর্থাৎ নথিপত্রের বিষয়টি এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
তবে সোনাগাছির সমস্ত যোগ্য মহিলা ইতিমধ্যেই টাকা পেয়েছেন, এমনটা নয়। ‘দুর্বার’ সূত্রে জানা গিয়েছে, যাচাই তালিকায় নাম থাকা কয়েকজন মহিলার সঙ্গে সরকারি কর্মীরা যোগাযোগ করতে পারেননি। যাচাইয়ের সময় তাঁরা পেশাগত কিংবা ব্যক্তিগত কাজে এলাকার বাইরে ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। ফলে তাঁদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি।
এই মহিলাদের জন্য সরকার বিশেষ শিবিরের আয়োজন করবে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে ‘দুর্বার’। সংগঠনের আশা, বিশেষ শিবির হলে যাঁদের যাচাই অসম্পূর্ণ রয়েছে বা কোনও কারণে বাদ পড়েছেন, তাঁদের সমস্যার দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে।
সোনাগাছি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ যৌনপল্লী। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলির অনুমান, সেখানে প্রায় ১০ হাজার যৌনকর্মী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মহিলা প্রতিদিন কাজের জন্য এলাকায় আসেন এবং কাজ শেষে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যান। প্রায় সাত হাজার যৌনকর্মী দীর্ঘদিন ধরে সোনাগাছিতেই বসবাস করছেন।
SIR-এর সময় এই এলাকার বহু মহিলার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কারণ, তাঁদের অনেকেই গ্রামাঞ্চল বা অন্য রাজ্য থেকে কলকাতায় এসেছেন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা কিংবা বহু বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে আসার কারণে পুরনো নথি সংগ্রহ করা অনেকের পক্ষেই কঠিন। জন্মের শংসাপত্র, শিক্ষাগত নথি বা পুরনো পরিচয়পত্রও অনেকের কাছে নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক গোপনীয়তার বিষয়টি। বহু যৌনকর্মীর পরিবার তাঁদের বর্তমান পেশার কথা জানে না। ফলে পরিবারের কাছে নিজের বর্তমান পরিচয় প্রকাশ না করেই পুরনো নথি সংগ্রহ করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যার কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেছিল। গত ডিসেম্বরে সোনাগাছির যৌনকর্মীদের জন্য বিশেষ শিবিরও আয়োজন করা হয়েছিল। সেই শিবিরে তৎকালীন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তথা বর্তমান মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল উপস্থিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
SIR পর্বের সেই উদ্বেগের পর এবার অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা অ্যাকাউন্টে ঢোকার খবরে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে সোনাগাছিতে। তবে এখনও যাঁদের যাচাই অসম্পূর্ণ, তাঁদের জন্য দ্রুত বিশেষ শিবিরের দাবি উঠেছে। এমন শিবির হলে আরও বেশি সংখ্যক যোগ্য মহিলা প্রকল্পের সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন বলে মনে করছে ‘দুর্বার’।