প্রায় তিন মাস ধরে নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষা ঘিরে দেশজুড়ে চলা বিতর্ক, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, লাগাতার ছাত্র আন্দোলন এবং বিরোধীদের তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণের পর অবশেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি। সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে প্রকাশ করেছেন দু'পাতার একটি আবেগঘন খোলা চিঠি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়; সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের শীর্ষে বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বটে।
'আমার পদ নয়, দেশের যুবশক্তিই বড়'
খোলা চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান লিখেছেন, গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। যন্তর মন্তর-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তাঁর পদ আঁকড়ে থাকার চেয়ে দেশের স্বার্থ এবং ছাত্রদের ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর কথায়, “এটি আমার ব্যক্তিগত প্রতিপত্তির প্রশ্ন নয়। ভারতমাতার যুবশক্তিই দেশের প্রকৃত শক্তি। আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কোনও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যেন দেশের ঐক্য নষ্ট করতে না পারে এবং আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যেন আইনি জটিলতার মধ্যে আটকে না পড়ে, সেই কারণেই আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি।” একই সঙ্গে তিনি তরুণ সমাজকে উদ্দেশ করে আবেদন জানান, কোনও বিভ্রান্তি বা উস্কানির রাজনীতিতে পা না দিতে। তাঁর দাবি, ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আজকের যুবসমাজের কাঁধেই।
নিট বিতর্কে সরকারের পদক্ষেপের ব্যাখ্যা
চিঠিতে নিট পরীক্ষাকে ঘিরে বিতর্কেরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর দাবি, অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পরই কেন্দ্র দ্রুত তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেয়। বাতিল হওয়া পরীক্ষা পুনরায় আয়োজন করা হয় এবং ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা রুখতে আগামী বছর থেকে সম্পূর্ণ কম্পিউটার-ভিত্তিক (CBT) পদ্ধতিতে নিট পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ১৬ জুলাই প্রকাশিত ফলাফলে দেশের বহু প্রত্যন্ত ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে দাবি করেন তিনি।
'নৈতিক দায় প্রথম দিন থেকেই নিয়েছি'
চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান দাবি করেছেন, নিট বিতর্ক সামনে আসার প্রথম দিন থেকেই তিনি নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন। পরীক্ষা মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে তাঁর অভিযোগ, এই পরিস্থিতিতে কিছু ব্যক্তি এবং সংগঠন ছাত্রদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে, যার ফলে অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা, ছাত্ররাজনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্মরণ করে ধর্মেন্দ্র প্রধান লেখেন, একটি স্বচ্ছ, আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাই উন্নত ভারতের ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ পাওয়াকে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রকের আধিকারিক, সহকর্মী এবং কর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। চিঠির শেষে জগন্নাথদেবের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে তিনি জানান, মন্ত্রিসভায় না থাকলেও দেশের যুবসমাজ, ওড়িশার মানুষ এবং ভারতের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাবেন।
এবার নজর প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ঘিরে ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলনের চাপেই এই সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে বিজেপির তরফে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
এখন প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবেন কি না, শিক্ষামন্ত্রকের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে এবং নিট-সহ জাতীয় স্তরের পরীক্ষাব্যবস্থায় আরও কী ধরনের সংস্কার আনা হবে। সেই উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে দেশের শিক্ষা প্রশাসনের আগামী অধ্যায়।