মুম্বই: চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বড় পর্দায় দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ‘ঘায়েল’, ‘গদর’, ‘বর্ডার’ থেকে ‘জাট’—অ্যাকশন ছবির হাত ধরে তৈরি হয়েছে তাঁর নিজস্ব দর্শক-পরিচিতি। কিন্তু এ বার সেই চেনা ছক ভেঙে ওটিটি-তে পা রেখেছেন সানি দেওল। নেটফ্লিক্সের আদালতকেন্দ্রিক ছবি ‘ইক্কা’-তে আইনজীবীর চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। তবে এই নতুন যাত্রায় প্রথমে খুব একটা নিশ্চিন্ত ছিলেন না অভিনেতা নিজেই। বরং নেটফ্লিক্সের আধিকারিক রুচিকা কপূর শেখকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ৬০ বছর বয়সে আবার কিসের অভিষেক?
নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ার অরিজিনাল ফিল্মস বিভাগের ডিরেক্টর রুচিকা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সানিকে ওটিটি-তে নিয়ে আসার অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর কথায়, সানিকে বার বার বলা হয়েছিল, এ বার নেটফ্লিক্সে তাঁর ‘ডেবিউ’ করার সময় এসেছে। তা শুনে হেসে অভিনেতা বলেছিলেন, “আমার বয়স ৬০ বছর। এখন আবার কীসের ডেবিউ?”
সানির এই প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য পিছিয়ে আসেননি রুচিকারা। বরং অভিনেতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, বড় পর্দার পরিচিত অ্যাকশন-হিরো ভাবমূর্তির বাইরে বেরিয়ে অন্য ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর সামনে।
অ্যাকশন নেই, তাই প্রথমে সংশয়
‘ইক্কা’ ছবিতে সানির চরিত্র একজন নামী আইনজীবীর। আদালতের লড়াই, নৈতিক দ্বন্দ্ব, পুরনো সম্পর্কের টানাপড়েন—এই নিয়েই ছবির গল্প। ছবিতে তাঁর বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন অক্ষয় খান্না। রয়েছেন দিয়া মির্জা এবং তিলোত্তমা শোমেও।
রুচিকার কথায়, ছবিতে অ্যাকশন না থাকাটাই প্রথমে সানির সংশয়ের কারণ ছিল। প্রায় চার দশক ধরে অ্যাকশনই তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য। ফলে এমন একটি ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন।
সানিকে আশ্বস্ত করতে রুচিকা বলেছিলেন, ওটিটি-র সবচেয়ে বড় সুবিধাই হল পরিচিত অভিনেতাকে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের গল্পে তুলে ধরার সুযোগ। আদালতকেন্দ্রিক ছবির মতো পরিচিত ঘরানায় সানিকে নতুন ভাবে দেখানো যাবে। দর্শকও বুঝতে পারবেন, অ্যাকশন ছাড়াও অন্য চরিত্রে কতটা সাবলীল তিনি।
রুচিকার কথায়, তিনি সানিকে বলেছিলেন, দু’মাস পরে হয়তো তাঁকেই বলতে হবে, ছবিতে একটি অ্যাকশন দৃশ্য রাখা উচিত ছিল। অথবা সানি নিজেই ফোন করে জানাবেন, সিদ্ধান্তটা খারাপ হয়নি। শেষ পর্যন্ত অভিনেতা আস্থা রেখেছিলেন নির্মাতা ও নেটফ্লিক্সের দলের উপর।
‘বর্ডার ২’ মুক্তির পরই অন্য পথে সানি
সানির সংশয়ের আরও একটি কারণ ছিল সময়। ‘বর্ডার ২’-এর মতো বড় মাপের অ্যাকশন ছবির পরই এমন একটি আদালতকেন্দ্রিক নাটকে অভিনয় করতে হবে তাঁকে। রুচিকার জানিয়েছেন, সানি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বর্ডার’ তো সবে মুক্তি পেয়েছে, তার পরেই কি এমন ছবিতে যাওয়া ঠিক হবে?
তবে শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্সের পরিকল্পনায় আস্থা রাখেন অভিনেতা। রুচিকার দাবি, সানি জানিয়েছিলেন, নির্মাতাদের ছবিটি নিয়ে যে বিশ্বাস রয়েছে, তার উপর ভরসা করেই তিনি নিজের সেরাটা দেবেন।
রুচিকার মতে, এই ছবির অভিনবত্বই দর্শকের কাছে আকর্ষণের জায়গা। সানিকে আবার অ্যাকশন করতে দেখার জন্য দর্শকের অভাব নেই। কিন্তু তাঁকে অন্য ঘরানায়, অন্য ধরনের চরিত্রে তুলে ধরাই ছিল ‘ইক্কা’-র বিশেষত্ব। নেটফ্লিক্সের কাছে ছবিটি তাই শুধু একজন তারকার ওটিটি-তে আসা নয়, বরং তাঁর পরিচিত অভিনয়-পরিসরকে নতুন ভাবে আবিষ্কারের সুযোগ।
আদালতে সানি, মুখোমুখি অক্ষয় খান্না
সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা পরিচালিত ‘ইক্কা’-র গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন অরুণ মেহরা নামে এক প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন সানি। অতীতের এক ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া মামলায় তাঁকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে পেশাগত দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সংঘাত তৈরি হয়। অক্ষয় খান্নার চরিত্র সেই পুরনো ক্ষতকে নতুন করে উস্কে দেয়।
ছবিতে তিলোত্তমা শোমে অভিনয় করেছেন এক দৃঢ়চেতা সরকারি কৌঁসুলির ভূমিকায়। দিয়া মির্জা রয়েছেন সানির স্ত্রীর চরিত্রে। ফলে আদালতের লড়াইয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরিবার এবং নৈতিকতার প্রশ্নও ছবির গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই ছবির হাত ধরেই দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর আবার পর্দায় একসঙ্গে দেখা গিয়েছে সানি দেওল ও অক্ষয় খান্নাকে। ‘বর্ডার’-এর পর তাঁদের এই পুনর্মিলন নিয়েও দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
ওটিটি-তে প্রথম, সাফল্যেও শীর্ষে ‘ইক্কা’
জুলাই মাসে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় ‘ইক্কা’। মুক্তির পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয় ছবির তালিকায় এক নম্বরে পৌঁছে যায় ছবিটি। চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের কাছে পরিচিত সানির ওটিটি-তে এই নতুন অবতারের সাফল্য তাই তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে বিনোদন মহল।
‘গদর ২’, ‘বর্ডার ২’ এবং ‘জাট’-এর মতো অ্যাকশন ছবির সাফল্যের পর সানির এই ঘরানা বদল প্রমাণ করল, দর্শকের কাছে তাঁর পরিচিতি শুধু অ্যাকশন দৃশ্য বা সংলাপের মধ্যে আটকে নেই। বরং নতুন চরিত্রে তাঁকে দেখার আগ্রহও রয়েছে।
৬০ বছর বয়সে ‘ডেবিউ’ নিয়ে সানির মজা করে করা প্রশ্নের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার উপর ভর করেই এ বার নতুন মঞ্চে পা রাখলেন তিনি। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অ্যাকশন-হিরোর বদলে এক আইনজীবী—সানির এই রূপান্তরই ‘ইক্কা’-কে ঘিরে দর্শকের আগ্রহের অন্যতম কারণ।




