নিউজ ডেস্ক: এল নিনোর প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের একাংশের মতে, এবারের পরিস্থিতি ‘সুপার এল নিনো’-র দিকে যেতে পারে। এর প্রভাবে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে আমেরিকা মহাদেশের কিছু এলাকায় বাড়তে পারে অতিবৃষ্টি। ফলে আগামী কয়েক মাসে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এই পরিস্থিতি নিয়ে এখনই বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের খাদ্যসংকটের আশঙ্কা করছেন না বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এর পিছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
প্রথম কারণ- খাদ্যশস্যের বড় মজুত
পরপর কয়েক বছর ভালো উৎপাদনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গম, চাল, ভুট্টা-সহ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যের মজুত যথেষ্ট রয়েছে। ফলে এল নিনোর কারণে কিছু অঞ্চলে উৎপাদন কমলেও মজুত থেকে সেই ঘাটতির একটা অংশ সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা FAO-র অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যেও বিশ্বব্যাপী খাদ্য মজুতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় কারণ- গমের মজুত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে
USDA-র তথ্য অনুযায়ী, চলতি শস্যবর্ষের শুরুতে বিশ্বের গমের মজুত প্রায় ২৮ কোটি মেট্রিক টনে পৌঁছতে পারে। উত্তর গোলার্ধের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক দেশে ভালো ফলন হয়েছে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের দেশগুলির উৎপাদন বিশ্ববাজারে গমের সরবরাহ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
তৃতীয় কারণ- চালের মজুতও রেকর্ড পর্যায়ে
২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বে মিলড রাইসের মজুত প্রায় ১৯ কোটি ৬২ লক্ষ টনে পৌঁছেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক চালের বাজারে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের সরকারি গুদামেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল মজুত রয়েছে। ফলে অতীতের এল নিনো পরিস্থিতির মতো এবারও চালের সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলে বাজারের একাংশ মনে করছে।
চতুর্থ কারণ- ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রস্তুতি
বিশ্বের অন্যতম বড় চাল আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানে উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মাথায় রেখে কৃষকেরা আগেভাগে ধান রোপণের কাজ শুরু করেছেন। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ চাল রপ্তানিকারক থাইল্যান্ডের জলাধারগুলিতেও পর্যাপ্ত জল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে সেখানে কৃষি উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা থাকতে পারে।
পঞ্চম কারণ- ভুট্টা ও সয়াবিনের সরবরাহ স্বস্তিদায়ক
USDA-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি সময়ে বিশ্বের ভুট্টার মজুত প্রায় ৩০ কোটি ৩৪ লক্ষ টনে পৌঁছতে পারে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সয়াবিনের মজুতও আগের বছরের রেকর্ডের কাছাকাছি। পর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টা, সয়াবিন এবং গমের দামে সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
ষষ্ঠ কারণ- সব অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব সমান হবে না
অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতের মতো অঞ্চলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হলেও চিন, ইউরোপ এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে প্রভাব কম হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে একটি অঞ্চলে উৎপাদন কমলেও অন্য অঞ্চলের সরবরাহ দিয়ে বিশ্ববাজারে ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে পুরো পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো অবস্থাও নেই। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। খাদ্যশস্যের ঘাটতির আশঙ্কায় কোনও দেশ যদি হঠাৎ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বা কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তাহলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়তে পারে।
অতীতেও খাদ্যসংকটের আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পথে হেঁটেছে। তাই এবারও শুধু উৎপাদন নয়, দেশগুলির বাণিজ্যনীতি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এল নিনোর প্রভাব কতটা হয় এবং বিভিন্ন দেশ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, তার উপরই আগামী দিনে বিশ্ব খাদ্যবাজারের ছবি অনেকটাই নির্ভর করবে।
