নিউজ ডেস্ক: কোনও অভিযুক্তকে গ্রেফতারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তার সময়সীমা পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থার খাতায়-কলমে নথিভুক্ত 'আনুষ্ঠানিক গ্রেফতার' বা ফর্মাল অ্যারেস্টের সময় থেকে শুরু হবে না। বরং, যে মুহূর্তে কোনও ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব করে তাঁকে আটক বা ডিটেন করা হচ্ছে, সেই মুহূর্ত থেকেই ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা গণনা শুরু হবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এবং বিচারপতি অতুল এস চান্দুরকরের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আটক এবং গ্রেফতারের মধ্যে কৃত্রিম কোনও পার্থক্য তৈরি করা সংবিধানবিরোধী ও আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
একটি মামলার শুনানি চলাকালীন শীর্ষ আদালত লক্ষ্য করে যে, আবেদনকারীদের ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টোর সময় তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তকরণের অংশ হিসেবে প্রথমে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশি নথিতে তাঁদের আনুষ্ঠানিক গ্রেফতার দেখানো হয় ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায়। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারের আগে প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে ওই ব্যক্তিদের কোনও বিচারবিভাগীয় তদারকি বা জুডিশিয়াল ওভারসাইট ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট ত্রিপুরা হাইকোর্টের একটি রায় বাতিল করে অভিযুক্তদের জামিন মঞ্জুর করে এবং স্পষ্ট ভাষায় জানায় যে, এটি সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
রায়ের মূল দিক ও নির্দেশ
১. আটক ও গ্রেফতারের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন নয়: তদন্তকারী সংস্থাগুলি অনেক সময় নিজেদের সুবিধামতো জেরা বা তদন্তের নামে কোনও ব্যক্তিকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখে এবং পরে সুবিধা অনুযায়ী গ্রেফতারের সময় দেখায়। আদালত জানিয়েছে, আটক এবং আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারের মধ্যে এমন কোনও 'বাফার জোন' বা কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।
২. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা বাধ্যতামূলক: কোনও ব্যক্তিকে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ আটকস্থল থেকে আদালতে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় সময় বাদ দিয়ে, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির না করা হলে তাঁকে অবিলম্বে হেফাজত থেকে মুক্তি দিতে হবে।
৩. ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ দায়িত্ব: সুপ্রিম কোর্ট দেশের সমস্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছে যে, যখনই কোনও অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হবে, তখন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে নথিতে ওই ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব বা তাঁকে প্রথম আটক করার প্রকৃত তারিখ ও সময় নির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
৪. BNSS-এর ৫৮ নম্বর ধারার গুরুত্ব: নতুন ফৌজদারি আইন 'ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩' (BNSS)-এর ৫৮ নম্বর ধারার উল্লেখ করে আদালত জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টার কম সময় আটক রাখলেও সেই আটক মামলার পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তিসংগত হতে হবে। কোনও যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া পুলিশ কাউকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখলে ম্যাজিস্ট্রেট পরবর্তী রিমান্ডের আবেদন নাকচ করে দিতে পারেন।
৫. মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা: UAPA, NDPS বা PMLA-র মতো বিশেষ আইনগুলির কঠোর শর্তাবলির ঊর্ধ্বে নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। কোনও বিশেষ আইনই সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারে না।
শীর্ষ আদালত এই রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, প্রায়শই দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক গ্রেফতার দেখানোর আগের অন্তর্বর্তী সময়েই অভিযুক্তদের উপর পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বা কাস্টডিয়াল ভায়োলেন্স চালানো হয়। এই প্রবণতা বন্ধ করতেই আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনও ব্যক্তির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে তাঁকে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই আইনের চোখে তিনি হেফাজতে বা কাস্টডিতে রয়েছেন বলে গণ্য হবেন, তা পুলিশি ডায়েরিতে নথিভুক্ত হোক বা না হোক।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে তদন্তের নামে পুলিশ বা কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সাধারণ মানুষকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা এবং গ্রেফতারের সময় নিয়ে কারচুপি করার প্রবণতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করা হল।




