কোচি: তিন তরতাজা প্রাণের মৃত্যু। বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা বিলাসবহুল মিনি কুপার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছিলেন স্কুটারে থাকা তিন তরুণ-তরুণী। অভিযোগ, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন চালক। ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা কেরলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছিলেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মৃতদের পরিবারের সদস্যেরা। কিন্তু জনতার আবেগ বা সামাজিক চাপের ভিত্তিতে জামিনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আইন ও বিচারপ্রক্রিয়ার নিরিখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মিনি কুপার দুর্ঘটনা মামলায় শুক্রবার এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কেরল হাইকোর্ট। চার অভিযুক্তেরই জামিন মঞ্জুর করেছে আদালত। তবে মূল অভিযুক্ত সুহেল সাজিভকে আরও ১০ দিন জেল হেফাজতে থাকতে হবে। অন্য তিন অভিযুক্ত নিনভ, আমিন শাহ এবং জয়ল এস আন্তোকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি কওসর এডাপ্পাগথের বেঞ্চে শুক্রবার এই মামলার শুনানি হয়। শুনানিতে আদালত জানায়, দুর্ঘটনাটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিন জনের মৃত্যু হয়েছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু সেই কারণে জনমতের ভিত্তিতে বিচারিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। আদালতের কথায়, ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’ বা সাধারণ মানুষের আবেগকে জামিনের সিদ্ধান্তের মাপকাঠি করা যায় না। আইন এবং নির্ধারিত বিচারপ্রক্রিয়া মেনেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযুক্তেরা প্রায় এক মাস ধরে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। ইতিমধ্যে দু'দফায় তাঁদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তদন্তের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অভিযুক্তদের অনির্দিষ্টকাল জেলে আটকে রাখার পিছনে যথেষ্ট কারণ থাকা প্রয়োজন।
মূল অভিযুক্তকে আরও ১০ দিন জেলে থাকার নির্দেশ
এই মামলায় প্রথম অভিযুক্ত সুহেল সাজিভের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় তিনিই মিনি কুপার গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মদ্যপ অবস্থায় অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। শুক্রবার আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করলেও অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেয়নি। আরও ১০ দিন জেল হেফাজতে থাকার পর তাঁকে মুক্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে আদালত।
অন্য দিকে, গাড়িতে থাকা বাকি তিন যাত্রী নিনভ, আমিন শাহ এবং জয়ল এস আন্তোকে জামিন দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ দিন জেলে থাকার কোনও নির্দেশ দেয়নি আদালত।
শুনানিতে বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, তদন্ত যখন প্রায় শেষ, প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ যখন সংগ্রহ করা হয়েছে, তখন অভিযুক্তদের হেফাজতে রাখার প্রয়োজনীয়তা কী? আদালতের বক্তব্য, শুধু মদ্যপান বা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগ থেকেই অভিযুক্তদের অপরাধ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ছিল বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। প্রতিটি অভিযোগের বিচার করতে হবে সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে।
কী ঘটেছিল সেই রাতে?
ঘটনাটি ১১ অক্টোবর। কোচির নেডুম্বাসেরি বিমানবন্দর-আথানি রোডে গভীর রাতে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। পুলিশের অভিযোগ, সুহেল সাজিভের চালানো দ্রুতগতির মিনি কুপার একটি স্কুটারে ধাক্কা মারে। স্কুটারে ছিলেন তিন জন—ইয়াস, দেবিকা এবং গোপিকা। দুর্ঘটনায় তিন জনেরই মৃত্যু হয়।
মৃতদের মধ্যে দেবিকা ওয়ানাড়ের বাসিন্দা, গোপিকা পালাক্কাড়ের এবং ইয়াস কর্নাটকের সুল্লিয়ার বাসিন্দা। তাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম কাজ করতেন বলে জানা যায়। সহকর্মীদের সঙ্গে চা খেয়ে ফেরার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। তদন্তে পুলিশের অভিযোগ, দুর্ঘটনার আগে সুহেল ও তাঁর সঙ্গীরা একাধিক পানশালায় গিয়েছিলেন। চালক মদ্যপ ছিলেন জেনেও অন্য অভিযুক্তেরা তাঁকে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার বেগে ছুটছিল গাড়ি!
দুর্ঘটনার তদন্তে মিনি কুপার গাড়িটির প্রযুক্তিগত তথ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা বিএমডব্লিউয়ের প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার প্রায় পাঁচ সেকেন্ড আগে গাড়িটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার। সংঘর্ষের মুহূর্তে সেই গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার।
গাড়ির অ্যাডভান্সড ক্র্যাশ সেফটি মডিউল থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গতির হিসাব সামনে আসে। দুর্ঘটনার মাত্র এক সেকেন্ড আগে ব্রেক প্রয়োগ করা হয়েছিল বলেও প্রযুক্তিগত রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশের দাবি, সুহেলের রক্ত ও মূত্রের নমুনায় নির্ধারিত সীমার পাঁচ গুণেরও বেশি অ্যালকোহলের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। এই তথ্যপ্রমাণকে সামনে রেখেই তাঁর বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের অভিযোগ আনা হয়।
তিন সহযাত্রীর বিরুদ্ধেও কেন মামলা?
শুধু চালক সুহেল নন, গাড়িতে থাকা অন্য তিন জনের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করে পুলিশ। তদন্তকারীদের অভিযোগ, চালক যে মদ্যপ অবস্থায় রয়েছেন এবং বিপজ্জনক গতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন, তা অন্য যাত্রীরা জানতেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁকে বাধা দেননি, বরং উৎসাহিত করেছিলেন।
এই যুক্তিতেই তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধে প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগ আনা হয়। যদিও অভিযুক্তদের আইনজীবীরা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ঘটনাটি বেপরোয়া ও অবহেলাজনিত গাড়ি চালানোর দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। অনিচ্ছাকৃত খুনের মতো গুরুতর অভিযোগের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
আগেও দু'বার খারিজ হয়েছিল জামিনের আবেদন
হাইকোর্টে যাওয়ার আগে অভিযুক্তেরা নিম্ন আদালতে জামিনের আবেদন করেছিলেন। প্রথমে অঙ্গমালির জুডিশিয়াল ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং পরে এর্নাকুলামের অতিরিক্ত দায়রা আদালত তাঁদের আবেদন খারিজ করে দেয়।
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য ছিল, অভিযুক্তেরা মুক্তি পেলে সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারেন কিংবা তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করতে পারেন। বিশেষ করে মৃতদের পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা ছিল, অভিযুক্তেরা প্রভাবশালী পরিবারের হওয়ায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করতে পারেন।
তবে শুক্রবার হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্তদের হেফাজতে থাকার সময়কাল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা তথ্যপ্রমাণ—সব দিক বিবেচনা করেই জামিনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জনতার ক্ষোভ বনাম বিচারপ্রক্রিয়া
এই মামলাকে ঘিরে কেরলে ইতিমধ্যেই ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিন তরুণ-তরুণীর মৃত্যুর পর মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং বেপরোয়া গতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছিল। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়েছে।
সেই আবহেই হাইকোর্টের শুক্রবারের পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছে, কোনও ঘটনা নিয়ে জনমানসে যতই ক্ষোভ তৈরি হোক, জামিনের প্রশ্নে আদালতকে আইনের নির্দিষ্ট মাপকাঠি অনুসরণ করতে হবে।
তবে জামিন পাওয়া মানেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়া নয়। মামলার বিচার চলবে এবং অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত আদালতেই নির্ধারিত হবে। তিনটি প্রাণহানির ঘটনায় দায় কার, দুর্ঘটনার জন্য ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা কতটা—সেই প্রশ্নগুলির চূড়ান্ত উত্তর এখনও বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায়।




