নয়াদিল্লি: রাজধানীর আকাশে দূষণের ধূসর চাদর। বাতাসে বিষের মাত্রা এতটাই বেশি যে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নেওয়াও কার্যত স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির বায়ুদূষণ নিয়ে ফের উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার দূষণ সংক্রান্ত মামলার শুনানির শুরুতেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্য, ‘‘আশা করি দিল্লির আবহাওয়া আপনারা উপভোগ করছেন!’’ পরিস্থিতির ভয়াবহতার মধ্যে প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য কার্যত প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মহনাকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের বেঞ্চে দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের (এনসিআর) বায়ুদূষণ সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়। শুনানিতে আদালতকে দূষণ পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানান প্রবীণ আইনজীবী অপারাজিতা সিং। এই মামলায় আদালতকে সহায়তা করছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দিল্লি-এনসিআরের বাতাসের গুণমান এখনও ‘সিভিয়ার’ বা ভয়াবহ পর্যায়ে ঘোরাফেরা করছে। এমনকী দূষণের প্রভাব তাঁর গলার স্বরেও পড়েছে।
দূষণের ভয়াবহতা বোঝাতে একটি চাঞ্চল্যকর তুলনাও টানেন তিনি। তাঁর কথায়, দিল্লি-এনসিআরের বাতাসে শ্বাস নেওয়া কার্যত প্রতিদিন ৩০টি সিগারেট খাওয়ার সমান। অর্থাৎ, কেউ ধূমপান না করলেও রাজধানীর দূষিত বাতাসের কারণে তাঁর শরীরে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর দূষিত পদার্থ প্রবেশ করছে।
বৃষ্টিতে সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান কোথায়?
দিল্লির বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক বৃষ্টির ভূমিকার কথাও শুনানিতে উঠে আসে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, বৃষ্টির কারণে কিছুটা কমেছিল দূষণের মাত্রা। পাশাপাশি আগামী বীজ বপনের মরসুমের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় কৃষিজমিতে আগুন দিয়ে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর প্রবণতা বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিয়েও আশা প্রকাশ করে আদালত।
তবে আইনজীবী অপারাজিতা সিংয়ের বক্তব্য, দিল্লির মোট দূষণের প্রায় ১৪ শতাংশের জন্য দায়ী ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো। তাঁর মতে, এমনিতেই দিল্লির বাতাস অত্যন্ত দূষিত। তার উপর কৃষিজমিতে খড়কুটো পোড়ানোর ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শুধু কৃষিজমিতে আগুন দেওয়া নয়, শহরের ভিতরে আবর্জনা পোড়ানোর মতো স্থানীয় দূষণের উৎসগুলিও দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন।
কৃষকদের আগাম আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব
দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের বক্তব্য, ফসলের অবশিষ্টাংশ বা নাড়া সংগ্রহের জন্য কৃষকদের কত দাম দেওয়া হবে, তা অনেক আগে থেকেই ঘোষণা করা উচিত। শুধু দাম ঘোষণা করলেই হবে না, সেই অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত পরিকাঠামোও তৈরি করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকে সরাসরি যুক্ত করার পক্ষেও সওয়াল করেছে শীর্ষ আদালত। কারণ, ফসল কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা নাড়া সরানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং আর্থিক প্রণোদনা না থাকলে অনেক কৃষকই অপেক্ষাকৃত সহজ উপায় হিসেবে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। ফলে আগাম দাম ঘোষণা এবং সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলে কৃষকদের বিকল্প পথ বেছে নিতে উৎসাহিত করা সম্ভব বলে মনে করছে আদালত।
আসলে দিল্লির বায়ুদূষণের সমস্যা কোনও একটি কারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিজমিতে নাড়া পোড়ানো, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলো, শিল্পাঞ্চলের নির্গমন এবং শহরের ভিতরে আবর্জনা পোড়ানো—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে শুধু শীতের মরসুমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষ করে প্রতি বছর শীতের শুরুতে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় বাতাসের গুণমান দ্রুত খারাপ হতে থাকে। বাতাসের গতি কমে যাওয়া এবং আবহাওয়ায় দূষিত কণার আটকে থাকার মতো পরিস্থিতিতে দূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টি বা ঝোড়ো হাওয়ায় সাময়িক স্বস্তি মিললেও দূষণের উৎসগুলি নিয়ন্ত্রণে না আনলে সমস্যা থেকেই যায়।
সুপ্রিম কোর্টের শুক্রবারের শুনানিতে তাই স্পষ্ট হয়েছে, দূষণ মোকাবিলায় শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা, সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাজধানীর বাতাসে যখন শ্বাস নেওয়াই কার্যত ধূমপানের সমান ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, তখন প্রশ্ন একটাই, দিল্লিবাসীকে নির্মল বাতাস দিতে প্রশাসন কবে সক্রিয় হবে?




