প্যারাগুয়ে: একটি ব্যাঙ্কের পতন ঘিরে কার্যত অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি লাটিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে। রাতারাতি ভেঙে পড়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘উয়েনো ব্যাঙ্ক’। আর তার জেরেই বিপাকে পড়েছেন প্রায় ৩০ লক্ষ গ্রাহক। কারও সারা জীবনের সঞ্চয়, কারও পেনশনের টাকা, আবার কারও মাসের বেতন—সবই আটকে গিয়েছে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেছেন দেশের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা।
প্রায় ৬৫ লক্ষ জনসংখ্যার প্যারাগুয়েতে উয়েনো ব্যাঙ্কের গ্রাহক ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি। মঙ্গলবার ভোরে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ বা ‘রেজ়োলিউশন’ প্রক্রিয়ার আওতায় নিয়ে আসে। কারণ, ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল ব্যাঙ্কটি। হিসাবপত্র খতিয়ে দেখার পর দেখা যায়, লোকসান সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন নির্ধারিত সীমার অর্ধেকেরও নীচে নেমে গিয়েছে।
এর পরেই বন্ধ হয়ে যায় ব্যাঙ্কের অ্যাপ, কার্ড এবং অর্থ স্থানান্তরের পরিষেবা। শাখাগুলিতেও তালা পড়ে। ফলে নিজেদের জমানো টাকা তুলতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েন গ্রাহকেরা। পেনশনভোগী থেকে শুরু করে বেতনভুক কর্মচারী, সকলেই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষও হয়।
এই সঙ্কটের আঁচ পড়ে দেশের রাজনীতিতেও। বিরোধীদের অভিযোগ, উয়েনো ব্যাঙ্কের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পেনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত তিনি ব্যাঙ্কটির মূল সংস্থা ‘গ্রুপো ভাসকেজ়’-এর অংশীদার ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, পেনশন তহবিলের অপব্যবহার এবং ব্যাঙ্কের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমনকি তাঁকে ইমপিচ করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল।
এদিকে ব্যাঙ্কটির ঋণ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, মালিকপক্ষের ঘনিষ্ঠ একাধিক সংস্থাকে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ব্যাঙ্কটির কাছে প্রায় ৮০ কোটি ডলারের সরকারি আমানতও জমা ছিল। এর মধ্যে পেনশন ও স্বাস্থ্য তহবিলের অর্থও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সমাজের স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রক্ষা করার যুক্তি দিয়ে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন পেনা। তবে ব্যাঙ্কের সঙ্কটের দায় সরাসরি স্বীকার করেননি তিনি। জানিয়েছেন, আমানতকারীরা যাতে তাঁদের টাকা ফেরত পান, সেটাই তাঁর অগ্রাধিকার।
ইতিমধ্যে উয়েনো ব্যাঙ্কের আট জন উচ্চপদস্থ আধিকারিককে আটক করা হয়েছে। তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। অন্যদিকে, গ্রাহকদের অর্থ ফেরাতে এবং যাঁদের একমাত্র অ্যাকাউন্ট ছিল উয়েনোতে, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, কীভাবে একটি দেশের এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঙ্কের ভিত এত দ্রুত ভেঙে পড়ল? আর সেই ধাক্কায় কেন শেষ পর্যন্ত গদি ছাড়তে হল দেশের প্রেসিডেন্টকে?




