সাংহাই, ৬ নভেম্বর: মানুষের চাকরি কি সত্যিই কেড়ে নেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI? কর্মক্ষেত্রে রোবটের দাপট কি ক্রমশ বাড়বে? এই প্রশ্ন যখন গোটা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে, তখন চিনে এক অভিনব পরীক্ষা সামনে এল। একটি দোকানে টানা ২৪ ঘণ্টার কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ছ'টি হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো দেখতে রোবটকে। ক্রেতাদের অভ্যর্থনা জানানো থেকে শুরু করে তাক ভর্তি করা, কফি তৈরি, গরম খাবার পরিবেশন, টেবিল পরিষ্কার—সবই ছিল তাদের কাজের তালিকায়। কিন্তু পরীক্ষার শেষে দেখা গেল, ছ'জনের মধ্যে চার জন উত্তীর্ণ হলেও দু'জনের চাকরি কার্যত পাকা হল না! এক রোবট আবার কাজের সময় নির্দিষ্ট পথ ছেড়ে বাইরে চলে গিয়েছে। অন্যটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, দোকানের তাক পরীক্ষা করা এবং পণ্য পুনরায় সাজানোর কাজে তার যথেষ্ট উদ্যোগ ছিল না। অর্থাৎ, মানুষের মতো দেখতে হলেই যে মানুষের মতো দক্ষ কর্মী হওয়া যায় না, তা ফের বুঝিয়ে দিল চিনের এই পরীক্ষা।
চিনের রোবট নির্মাতা সংস্থা অ্যাজিবট (AGIBOT) সাংহাইয়ের জুহুই এলাকায় একটি চালু কনভিনিয়েন্স স্টোরে এই অভিনব পরীক্ষার আয়োজন করেছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘রোবটস নেভার ক্লক আউট’ (Robots Never Clock Out)। গত ২ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে ৩ নভেম্বর সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে এই পরীক্ষা। দোকানটি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য খোলা ছিল। ফলে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারের পরিবেশে নয়, বাস্তব দোকানের পরিস্থিতিতেই কাজ করতে হয়েছে রোবটগুলিকে।
২৪ ঘণ্টায় ১,৭৩০টি কাজ!
পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল অ্যাজিবটের তৈরি G2 মডেলের ছ'টি হিউম্যানয়েড রোবট। দিনের বিভিন্ন সময়ের কাজের চাপ বুঝতে পরীক্ষাটিকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছিল। দুপুরের ব্যস্ত সময়, সন্ধ্যার ভিড়, গভীর রাতের কাজ এবং সকালের প্রাতরাশের ব্যস্ততা—প্রতিটি পরিস্থিতিতেই রোবটগুলির দক্ষতা যাচাই করা হয়।
সংস্থার প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় সব ক'টি রোবট মিলিয়ে মোট ১,৭৩০টি কাজ সম্পন্ন করেছে। তার মধ্যে রয়েছে ৬৮৩ বার ক্রেতাদের অভ্যর্থনা জানানো, ৩৬৯টি পণ্য সংগ্রহ ও ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া, ১৪৭ কাপ কফি তৈরি, ১২৬টি গরম খাবারের অর্ডার সামলানো, ২৭৭ বার দোকানের তাক পরীক্ষা ও পণ্য পুনরায় সাজানো এবং ১২৮ বার টেবিল পরিষ্কার করা।
সংখ্যার নিরিখে কাজের পরিমাণ নেহাত কম নয়। কিন্তু শুধু কতগুলি কাজ সম্পন্ন হল, তা দিয়ে রোবটের দক্ষতা বিচার করতে রাজি নয় সংস্থাটি। কারণ, বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজ করতে গিয়ে কোথায় কোথায় যন্ত্রমানবগুলি সমস্যায় পড়ছে, সেটাও ছিল পরীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য।
আবর্জনার পাত্র দেখেই পথ ভুলল রোবট!
পরীক্ষার সবচেয়ে মজার এবং একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে রাতের শিফটে। পরিষ্কারের দায়িত্বে থাকা একটি রোবট দোকানের নির্দিষ্ট জায়গায় কাজ করছিল। কিন্তু একটি আবর্জনার পাত্র ভর্তি হয়ে যাওয়ায় তার নির্ধারিত চলার পথে পরিবর্তন ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সে নিজের নির্দিষ্ট পথ ছেড়ে দোকানের বাইরে চলে যায়। এমনকি নির্ধারিত জায়গায় ফিরে আসতেও ব্যর্থ হয়।
অন্য একটি রোবটের দায়িত্ব ছিল দোকানের তাক পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য পুনরায় সাজিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেই কাজে তার উদ্যোগের অভাব ধরা পড়ে। দোকানে কোন পণ্য কমে যাচ্ছে, কোন তাক নতুন করে ভর্তি করা প্রয়োজন, সেই কাজের গতি প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল না। ফলে মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হতে পারেনি সেটিও।
চিনের প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যম ITHome-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুই রোবটকে আপাতত পরীক্ষার মূল দল থেকে বাদ রাখা হয়েছে। বাকি চারটি রোবট মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হয়েছে।
চিনিযুক্ত ও চিনিমুক্ত কোলার ফারাকও বুঝতে হল
শুধু দোকানের নিয়মিত কাজ করলেই চলবে না, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে কতটা বুদ্ধি খাটাতে পারে, সেটাও যাচাই করা হয়েছিল। পরীক্ষার সময় কয়েক জন অংশগ্রহণকারী রোবটগুলির সামনে ইচ্ছাকৃত ভাবে কিছু কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেন।
যেমন, চিনিযুক্ত এবং চিনিমুক্ত কোকা-কোলার ক্যান দেখতে প্রায় একই রকম। সেখান থেকে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সঠিক পানীয়টি চিহ্নিত করতে বলা হয় রোবটকে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের চলার পথে বাধা তৈরি করা হয়। খাবার তোলার সময় পাত্র নাড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে বোঝা যায়, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রোবট কতটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।
এই পরীক্ষাগুলির মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা হয়েছে, রোবটগুলি শুধুমাত্র আগে থেকে নির্ধারিত নির্দেশ পালন করতে পারে, নাকি পরিস্থিতি বুঝে নিজের কাজের ধরনও বদলাতে সক্ষম।
মানুষের চাকরির ভবিষ্যৎ কি রোবটের হাতে?\
এই পরীক্ষা আবারও সামনে এনেছে কর্মক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই কারখানা, গুদাম, হোটেল, রেস্তরাঁ এবং খুচরো ব্যবসায় রোবট ব্যবহারের পরীক্ষা চলছে। বিশেষ করে যেখানে একই ধরনের কাজ বারবার করতে হয়, সেখানে যন্ত্রমানব ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি।
কিন্তু একটি দোকান চালানো শুধু নির্দিষ্ট কাজের তালিকা মেনে চলা নয়। ক্রেতার আচরণ বুঝতে হয়, হঠাৎ তৈরি হওয়া সমস্যা সামলাতে হয়, পণ্য শেষ হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়। কখনও অসন্তুষ্ট ক্রেতাকে বোঝাতে হয়, কখনও আবার একই সময়ে একাধিক কাজ সামলাতে হয়। এই জায়গাগুলিতেই এখনও মানুষের সঙ্গে রোবটের দক্ষতার ফারাক রয়েছে।
তাছাড়া রোবট পরিচালনার খরচ, ব্যাটারি চার্জ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে মানুষের সাহায্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাজিবটের এই পরীক্ষায় ২৪ ঘণ্টা সম্প্রচার চললেও প্রতিটি রোবট একটানা ২৪ ঘণ্টা চার্জ বা মানুষের সাহায্য ছাড়া কাজ করেছে কি না, তার কোনও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তথ্য প্রকাশিত হয়নি। সংস্থার প্রকাশিত হিসাবেও কাজের সাফল্যের হার বা প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করতে কত সময় লেগেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ নেই।
রোবটের কর্মদক্ষতা যাচাইয়ে নতুন অধ্যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিউম্যানয়েড রোবটের প্রযুক্তিগত উন্নতি দ্রুত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রে মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে গেলে আরও অনেকটা পথ পেরোতে হবে। কোনও রোবটকে একবার কফি তৈরি করতে দেখা আর তাকে প্রতিদিন শত শত ক্রেতার জন্য নির্ভুল ভাবে কফি তৈরি করতে দেওয়া এক বিষয় নয়। একই ভাবে, একটি পণ্য তুলে তাকের উপর রাখা আর দোকানের পরিস্থিতি বুঝে নিজে থেকে পণ্য পুনরায় সাজানোর মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
চিনের এই পরীক্ষার তাৎপর্য এখানেই। রোবটগুলি শুধু কতটা কাজ করতে পারে, তা নয়, কোথায় ব্যর্থ হয়, সেটাও প্রকাশ্যে এসেছে। চারটি রোবটের সাফল্যের পাশাপাশি দু'টির ব্যর্থতাও প্রযুক্তির বর্তমান সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করেছে।
সব মিলিয়ে, মানুষের মতো দেখতে রোবটকে দোকানের কর্মী হিসেবে কাজে লাগানোর পরীক্ষা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুললেও এখনই মানুষের চাকরি পুরোপুরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা করার কারণ নেই। বরং এই পরীক্ষা দেখিয়ে দিল, মানুষের মতো হাত-পা থাকলেই মানুষের মতো উপস্থিত বুদ্ধি, দায়িত্ববোধ এবং পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা তৈরি হয় না। চাকরির বাজারে মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে রোবটকে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে!




