দোহা: যুদ্ধের ময়দানে সংঘাত, কূটনীতির টেবিলে দর-কষাকষি! আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসানে নতুন করে আলোচনার পথ খুলতে উদ্যোগী হল ইরান। কাতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পরমাণু সংক্রান্ত একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। কিন্তু সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসার আগে আমেরিকাকে সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ইরান। শুধু তাই নয়, শর্তগুলি মানা না হলে কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীও খুলে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ফলে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পথ যে এখনও যথেষ্ট কঠিন, তা স্পষ্ট।
বৃহস্পতিবার এক শীর্ষ ইরানি আধিকারিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, কাতারের মাধ্যমে আমেরিকার কাছে নতুন পরমাণু প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। ওয়াশিংটন সেই প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে। তবে প্রস্তাবের বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আনতে চাননি ওই আধিকারিক। তাঁর বক্তব্য, তেহরানের সাত দফা দাবি পূরণ না হলে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় এগোবে না ইরান।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিক মোহসেন রেজাইও বৃহস্পতিবার রাশিয়া সফরে গিয়ে একই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে আমেরিকার কাছে সাতটি শর্ত পেশ করেছে তেহরান। সেই শর্তগুলি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খুলবে না, আলোচনাও শুরু হবে না।
কী কী রয়েছে ইরানের সাত শর্তে?
ইরানের দাবিগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আমেরিকার আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি, ব্যাঙ্কিং লেনদেন এবং বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েছে ইরান। সেই বাধা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তেহরান।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের আর্থিক সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে একাধিক দেশে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে। সেই অর্থ ফেরত চায় ইরান।
তৃতীয়ত, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আমেরিকাকে। ইরানের বক্তব্য, সামরিক সংঘাতে তাদের পরিকাঠামো এবং অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় এড়াতে পারে না ওয়াশিংটন।
চতুর্থত, ইরানের উপর সামরিক হামলা বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে নতুন করে হামলা হবে না, এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।
পঞ্চমত, লেবানন-সহ পশ্চিম এশিয়ার সমস্ত সংঘাতের অবসান ঘটাতে হবে। বিশেষ করে ইজরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজ়বুল্লার মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধ করার উপর জোর দিয়েছে তেহরান।
ষষ্ঠত, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই জলপথের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় ইরান।
সপ্তমত, পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলির অংশগ্রহণে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে হবে।
উল্লেখ্য, ইরানের বিভিন্ন আধিকারিকের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রস্তাবে এই দাবিগুলির উল্লেখ রয়েছে। তবে কাতারের মাধ্যমে পাঠানো নতুন পরমাণু প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ সাত দফা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এই সাতটি বিষয়কে নতুন প্রস্তাবের হুবহু সাতটি ধারা বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে কেন এত অনড় তেহরান?
ইরানের এই অবস্থানের পিছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণ করা হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ এটি।
বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ে, জাহাজ পরিবহণের খরচ বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিশেষ করে ভারত, চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলির জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথেই পৌঁছয়।
তাই হরমুজ প্রণালীকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আমেরিকার উপর চাপ বাড়াতে চাইছে তেহরান। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিকদের বক্তব্য, তাদের শর্ত পূরণ না হলে এই জলপথ খুলে দেওয়ার প্রশ্ন নেই।
ট্রাম্পের অবস্থান কী?
অন্য দিকে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানকে ছাড় দিতে নারাজ। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, যে কোনও প্রাথমিক আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা চায় আমেরিকা।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, আমেরিকার অনুমতি ছাড়া ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করতে পারবে না। ইরানের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটন কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এখানেই দু'দেশের অবস্থানের মূল সংঘাত। আমেরিকা চাইছে প্রথমেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি। অন্য দিকে, তেহরানের দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা অর্থ ফেরত এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে কোনও আলোচনাই নয়।
নির্বাচনে ধাক্কা খেয়ে কি আলোচনায় আগ্রহী ট্রাম্প?
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ধাক্কা খাওয়ার পর ইরান-নীতি নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের উপর। নির্বাচনে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, জ্বালানির দাম এবং বিদেশনীতি নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব পড়েছে ভোটে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক সমস্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। অন্য দিকে, ইরানও দীর্ঘদিনের সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে।
তবে নির্বাচনের ফলাফলই যে দু'দেশকে সমঝোতার পথে নিয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ট্রাম্প এখনও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। তেহরানও নতুন করে হামলা হলে আরও বিস্তৃত প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
মধ্যস্থতায় কাতার, নজর রাশিয়ার ভূমিকাতেও
দু'দেশের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের পরিবর্তে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে কাতার। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রস্তাব আদানপ্রদানের কাজ করছে দোহা। এর পাশাপাশি রাশিয়াও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিক মোহসেন রেজ়াইয়ের বৈঠক হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ুক, তা চাইছে না রাশিয়া ও চিন। কারণ, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপর তার প্রভাব পড়বে।
ভারতের উদ্বেগ কোথায়?
ইরান-আমেরিকা সংঘাতের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থও সরাসরি জড়িত। ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশ আসে বিদেশ থেকে। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের আমদানি খরচ, বাণিজ্য ঘাটতি এবং টাকার বিনিময় মূল্যের উপর।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ভারতীয় তেল আমদানিকারক সংস্থাগুলিকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে। তাতে পরিবহণ খরচ এবং বিমার খরচ বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে দেশের জ্বালানির দাম এবং মূল্যবৃদ্ধির উপর।
সব মিলিয়ে, কাতারের মাধ্যমে আমেরিকার কাছে ইরানের নতুন পরমাণু প্রস্তাব পাঠানো পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু আলোচনার আগে সাতটি শর্ত পূরণের দাবি এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি বুঝিয়ে দিচ্ছে, তেহরান সহজে কোনও সমঝোতায় যেতে রাজি নয়। এখন দেখার, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের শর্তের কতটা মেনে নেয়, নাকি পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নিজেদের অবস্থানেই অনড় থাকে। কূটনীতির এই টানাপড়েনের উপরই নির্ভর করছে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি।




