নিউজ ডেস্ক: একজনের বিদায় জুড়ে আবেগ, সম্মান আর বিশ্বজয়ের গৌরব। অন্যজনের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষটা বিতর্ক, অভিমান আর তিক্ততায় মোড়া। প্রজন্মের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো—দু’জনেই এ বছর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের বিদায়ের ছবিতে আকাশ-পাতাল তফাত। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যাঁদের তুলনা ঘিরে ফুটবলবিশ্ব উত্তাল, তাঁদের মধ্যে সর্বকালের সেরা হওয়ার লড়াইয়েও নতুন করে আলো পড়েছে।
৪১ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছেন রোনাল্ডো। বৃহস্পতিবার এক আবেগঘন ভিডিয়ো বার্তায় সেই ঘোষণা করেন পর্তুগিজ মহাতারকা। কিন্তু বিদায়ের আগে জাতীয় দলের কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের তিক্ততা সামনে চলে আসে। নরওয়ের বিরুদ্ধে উয়েফা নেশনস লিগের ম্যাচে খেলানোর আশ্বাস দিয়েও শেষ পর্যন্ত মাঠে না নামানোয় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি। অভিযোগ, ৩০ মিনিট খেলার কথা বলা হলেও কোচ কথা রাখেননি। এর পরেই দল ছেড়ে বেরিয়ে যান রোনাল্ডো। সংবাদমাধ্যমের সামনে জেসুস নিজের ভুল স্বীকার না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এমনকী, প্রায় ৭০ কোটি অনুসারীর কাছে সামাজিক মাধ্যমে দলের অন্দরের কথা প্রকাশ করেও বিতর্ক বাড়ান তিনি।
অথচ পর্তুগালের জার্সিতে রোনাল্ডোর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। ২৩৪ ম্যাচে তাঁর গোল ১৪৬টি, যা পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ। ২০১৬ সালে ইউরো এবং দু’বার উয়েফা নেশনস লিগ জিতেছে পর্তুগাল তাঁর নেতৃত্বে। চলতি বিশ্বকাপে ছ’টি আলাদা আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হওয়ার নজিরও গড়েছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক বড় প্রতিযোগিতাগুলিতে তাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের ইউরোতে একটিও গোল করতে পারেননি। চলতি বিশ্বকাপেও পর্তুগালের প্রথম একাদশে তাঁকে রাখা উচিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা কম হয়নি।
অন্যদিকে, মেসির আন্তর্জাতিক বিদায় অনেক বেশি গৌরবের। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে আট গোল ও চারটি গোলে সহায়তা করে দলকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। যদিও স্পেনের কাছে ফাইনালে হেরে যায় আর্জেন্তিনা, তবু মেসির পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় কিলিয়ান এমবাপের পরেই ছিলেন তিনি। ৩৪ বছর বয়সের পর জাতীয় দলের হয়ে তিনটি বড় খেতাব জিতেছেন মেসি। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে ফের কোপা আমেরিকা জিতে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিলেন।
একসময় আন্তর্জাতিক সাফল্যের বিচারে মেসির চেয়ে এগিয়ে ছিলেন রোনাল্ডো। ২০১৬ সালের ইউরো জিতে পর্তুগালকে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি এনে দিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে, ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে সাময়িক অবসর নেওয়ার পর ২০২১ সালে প্রথম কোপা আমেরিকা জেতেন মেসি। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জিতে দিয়েগো মারাদোনার উত্তরসূরি হিসেবে নিজের জায়গা আরও পোক্ত করেন আর্জেন্তাইন অধিনায়ক।
ক্লাব ফুটবলেও দু’জনের তুলনা চলেছে বছরের পর বছর। ব্যালন ডি’অর জয়ের সংখ্যায় এগিয়ে মেসি, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের সংখ্যায় রোনাল্ডো। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে মেসির শেষ দিকের সাফল্য তাঁকে বাড়তি কৃতিত্ব এনে দিয়েছে। দুই তারকার আন্তর্জাতিক ট্রফির সংখ্যা তিনটি করে হলেও মেসির বিশ্বকাপ জয়ই তুলনায় বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির গোল ২০৮ ম্যাচে ১২৬টি। অন্যদিকে, রোনাল্ডোর ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল। দু’জনেই দেশের ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। আর্জেন্তিনায় গত মাসে মেসির বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে আবেগের ঢেউ উঠেছিল। পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনও রোনাল্ডোর জন্য বিশেষ সংবর্ধনার আয়োজন করতে চায়। তবে ক্লাব ফুটবলে তাঁদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। রোনাল্ডোর সামনে রয়েছে কেরিয়ারের ১০০০ গোলের মাইলফলক। আপাতত তাঁর গোলসংখ্যা ৯৮৫। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় বন্ধ। সর্বকালের সেরা হওয়ার বিতর্কে মেসির বিশ্বজয়ের আলোয় রোনাল্ডোর বিদায়ের তিক্ততা যেন নতুন মাত্রা যোগ করল।




